লাহোর কালান্দার্সে আবারও মুস্তাফিজ

বাংলাদেশের বাঁহাতি ফাস্ট-মিডিয়াম পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে সরাসরি চুক্তিতে দলে নিয়েছে লাহোর কালান্দার্স। এটি কেবল একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বাস, ধৈর্য ও প্রায় এক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি সম্পর্কের স্বীকৃতি।

লাহোর কালান্দার্স ও মুস্তাফিজুর রহমানের এই যোগসূত্রের শুরু পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) একেবারে প্রথম ড্রাফট থেকে। সে সময় মুস্তাফিজ ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নবাগত এক তরুণ বোলার। বাংলাদেশের হয়ে তখন মাত্র কয়েকটি ম্যাচ খেলেছেন, আইপিএলেও অভিষেক হয়নি। সীমিত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও লাহোর কালান্দার্স তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিল এবং গোল্ড ক্যাটাগরিতে প্রথম পছন্দ হিসেবে তাকে দলে নেয়।

এই সিদ্ধান্ত ছিল তরুণ প্রতিভার প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিটির আস্থার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। অঞ্চলজুড়ে উদীয়মান ক্রিকেটারদের খুঁজে বের করা ও তাদের গড়ে তোলার যে দর্শন লাহোর কালান্দার্স শুরু থেকেই লালন করে আসছে, মুস্তাফিজ তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই মৌসুমে প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না পাওয়ায় মুস্তাফিজ লাহোরের হয়ে মাঠে নামতে পারেননি। ফলে কাঙ্ক্ষিত খেলোয়াড়-ফ্র্যাঞ্চাইজি অংশীদারিত্ব তখন বাস্তবায়িত হয়নি। তবে আগ্রহ ও পারস্পরিক সম্মান অটুট ছিল। লাহোর কালান্দার্স নিয়মিতভাবে তার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে, আর মুস্তাফিজ ধীরে ধীরে নিজেকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বোলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পরবর্তী কয়েক বছরে মুস্তাফিজুর রহমানের ক্যারিয়ার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃত হয়। বিশ্ব ক্রিকেটে তার কাটার ও বৈচিত্র্য তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। এই সময়েও তার সম্ভাবনাকে শুরুতেই স্বীকৃতি দেওয়া দলগুলোর অন্যতম ছিল লাহোর কালান্দার্স।

২০১৮ সালে সেই সম্পর্ক নতুন করে রূপ পায়। পিএসএলে আবারও মুস্তাফিজকে দলে নেয় লাহোর কালান্দার্স। সে মৌসুমে তিনি দলের হয়ে পাঁচটি ম্যাচ খেলেন। যদিও সময়টা সংক্ষিপ্ত ছিল, তবুও এটি ছিল বহুদিনের প্রত্যাশিত পুনর্মিলন। ২০১৮ সালের পর মুস্তাফিজ আর পিএসএল ড্রাফটের জন্য নাম নিবন্ধন করেননি।

গল্পের সর্বশেষ অধ্যায় শুরু হয় চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি। আইপিএলের জন্য নিবন্ধনের পর মুস্তাফিজের ম্যানেজার লাহোর কালান্দার্সের টিম ডিরেক্টর সামিন রানার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বহু বছরের পুরোনো সেই সম্পর্ক আবারও আলোচনায় আসে। সামিন রানা ইতিবাচক সাড়া দেন এবং মুস্তাফিজের প্রতি ফ্র্যাঞ্চাইজিটির দীর্ঘদিনের আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, লাহোর কালান্দার্স সবসময়ই মুস্তাফিজকে একজন ‘কালান্দার’ হিসেবেই দেখেছে।

এই চুক্তি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রত্যাশার আগেই বিদায় নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট হতাশাজনক সময় পার করছে। ভক্ত ও গণমাধ্যমের চাপের মধ্যে এমন মুহূর্তে লাহোর কালান্দার্সের এই সিদ্ধান্তকে শুধু ক্রিকেটীয় বিবেচনা নয়, বরং খেলোয়াড় ও বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতি এক ধরনের সমর্থনের বার্তা হিসেবেও দেখা যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, একটি টুর্নামেন্টের ফলাফল বা সাময়িক ফর্ম কোনো ক্রিকেটারের সামর্থ্য নির্ধারণ করে না।

লাহোর কালান্দার্স ও মুস্তাফিজুর রহমানের এই গল্প দেখায়, ক্রিকেটে সম্পর্ক কীভাবে সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়। যে গল্পের শুরু হয়েছিল একজন তরুণ বোলারকে ড্রাফটে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে—যে মৌসুমে তিনি খেলতেই পারেননি—সেই সম্পর্কই আজ বিশ্বাস ও অভিন্ন ইতিহাসের ভিত্তিতে সরাসরি চুক্তিতে রূপ নিয়েছে। প্রায় দশ বছর আগে লাহোর কালান্দার্স বাংলাদেশের এক তরুণ প্রতিভার মধ্যে যে সম্ভাবনা দেখেছিল, আজ সেই বিশ্বাসই নতুন করে বাস্তবতা পেয়েছে।

-এমইউএম