মাটির হাঁড়িতে পানি রাখলে পানি ঠান্ডা থাকে—এই প্রশ্নটা আমাদের গ্রামবাংলার জীবনে খুবই পরিচিত। আধুনিক ফ্রিজ বা কুলারের যুগের আগেও মানুষ মাটির হাঁড়ি বা কলসির ওপর ভরসা করেই গরমের দিনে ঠান্ডা পানি পান করত। এর পেছনে কোনো জাদু নয়, আছে একেবারে বৈজ্ঞানিক কারণ।
মাটির হাঁড়ি তৈরি হয় পোড়ামাটি দিয়ে, যার গঠন স্বভাবতই ছিদ্রযুক্ত। এই ছিদ্রগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পানি বাইরে বেরিয়ে আসে। হাঁড়ির ভেতরের পানি যখন এই ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে বাইরের দিকে আসে, তখন হাঁড়ির বাইরের পৃষ্ঠে খুব অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকে। এই পানি বাতাসের সংস্পর্শে এসে বাষ্পে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় বাষ্পীভবন।
বাষ্পীভবনের সময় পানি তার চারপাশ থেকে তাপ শোষণ করে নেয়। মাটির হাঁড়ির ক্ষেত্রে এই তাপ আসে হাঁড়ির ভেতরের পানি থেকেই। ফলে ভেতরের পানির তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমে যায় এবং পানি ঠান্ডা হয়ে ওঠে। যত বেশি বাষ্পীভবন ঘটে, তত বেশি তাপ শোষিত হয় এবং পানি তত ঠান্ডা থাকে। এই কারণেই গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটির হাঁড়ির পানি বেশি ঠান্ডা থাকে, আর আর্দ্র আবহাওয়ায় তুলনামূলক কম ঠান্ডা লাগে।
মাটির হাঁড়ির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি তাপ পরিবাহক হিসেবে খুব ধীর। অর্থাৎ বাইরে গরম থাকলেও সেই গরম দ্রুত হাঁড়ির ভেতরের পানিতে পৌঁছাতে পারে না। প্লাস্টিক বা ধাতব পাত্রের মতো মাটি দ্রুত তাপ গ্রহণ করে না, ফলে বাইরের তাপের প্রভাব ভেতরের পানিতে কম পড়ে। এই ধীর তাপ পরিবহনও পানিকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া মাটির হাঁড়ি সাধারণত খোলা ও বাতাস চলাচল আছে—এমন জায়গায় রাখা হয়। এতে বাতাসের চলাচল বাষ্পীভবনের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তোলে। হাঁড়ির গায়ে জমে থাকা পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং আরও তাপ শোষণ করে। ফলে পানির ঠান্ডা ভাব দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে।
স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও মাটির হাঁড়ির পানি অনেকের কাছে আরামদায়ক মনে হয়। প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ায় এই পানি খুব বেশি ঠান্ডা নয়, আবার গরমও নয়—যা শরীরের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। হঠাৎ করে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি খেলে যেমন গলা বা হজমের সমস্যা হতে পারে, মাটির হাঁড়ির পানিতে সে ঝুঁকি কম থাকে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, মাটির হাঁড়ির পানি হজমে সহায়ক এবং শরীরকে স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
সব মিলিয়ে, মাটির হাঁড়িতে পানি ঠান্ডা থাকার পেছনে রয়েছে বাষ্পীভবনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, মাটির ছিদ্রযুক্ত গঠন ও ধীর তাপ পরিবহন ক্ষমতা। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই সহজ, প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি আজও সমান কার্যকর।
-বিথী রানী মণ্ডল










