এপস্টেইন ঝড় ট্রাম্প নয়, এক বিশ্ব নেতার পতন ঘটাতে পারে

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কখনও জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে মেশেননি। কিন্তু কুখ্যাত এই যৌন অপরাধীর কারণেই তাঁর পদ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, এপস্টেইন নথিতে একাধিকবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে। কিন্তু তাঁর ক্ষমতা হারানো নিয়ে এখনও কোনো উদ্বেগ তৈরি হয়নি। চাপের মুখেও পড়েননি।

এই বৈসাদৃশ্য মূলত ট্রাম্পের তুলনামূলক রাজনৈতিক শক্তি এবং স্টারমারের সম্ভাব্য অস্তিত্ব সংকটের প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে, জবাবদিহিতা ও তদন্তের দায়িত্বে থাকা ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সক্রিয়। অন্যদিকে বিচার বিভাগের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ এবং রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেসে একক আধিপত্য তাঁকে এ যাত্রায় তদন্ত থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।

প্রকাশিত নথির উত্তাপ বর্তমানে নরওয়ে ও পোল্যান্ডেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এতকিছু এমন এক ব্যক্তির কারণে ঘটছে, যিনি প্রায় সাত বছর আগে আত্মহত্যা করেছেন। এই উত্তাপে কেবল স্টারমার একই পুড়ছেন বিষয়টা তেমনও নয়। রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁর নিজের ভাই এবং এপস্টেইনের সাবেক বন্ধু প্রিন্স অ্যান্ড্রুর রাজকীয় উপাধি বাতিল করেছেন। উইন্ডসর ক্যাসেল এস্টেটের লজ থেকে অ্যান্ড্রুকে সম্প্রতি বের করে দেওয়া হয়েছে।

বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে যারা এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের অধিকাংশকে নেতিবাচক পরিণতির মুখে পড়তে হয়নি। ব্যতিক্রম উদাহরণ কেবল সাবেক ট্রেজারি সেক্রেটারি ল্যারি সামার্স। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক প্রেসিডেন্ট গত বছর দায়িত্ব থেকে সরে যান। ইমেইলে এপস্টেইন ও তাঁর নারী বিদ্বেষী মন্তব্য সামনে আসায় ক্ষমাও চাইতে হয়।

মার্কিন বিচার বিভাগ যখন নথি সংক্রান্ত বিষয়ে মামলার পথে হাঁটছে না, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্ক পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চাইছেন। নথিতে তাঁর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কোনো সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযোগ গঠনেরও চেষ্টা করেনি। এ সুযোগে ট্রাম্প বলেছেন, এখন সময় এসেছে দেশের অন্য বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।

সংকটে স্টারমার
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও হয়তো মনে মনে দ্রুত বিতর্ক কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালেও তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব সুতার ওপর ঝুলে থাকার মতো অবস্থায় ছিল। কারণ, নিজ দল লেবার পার্টির এমপিদের মধ্যেই বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে।

এ বিদ্রোহের শুরু বুধবার হাউস অব কমনসের অধিবেশন থেকে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্টারমারকে সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যৌন অপরাধীর সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য জানার পরও স্টারমার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার নথি সামনে আসার পর গত বছরই ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন আগে প্রকাশিত নথি সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। নতুন নথিতে সামনে এসেছে ম্যান্ডেলসনের তথ্য পাচারের কথা। যুক্তরাজ্যের বাজার ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য তিনি এপস্টেইনের কাছে পাচার করেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। বুধবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উত্তপ্ত পরিবেশে স্টারমার কিছুটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, ‘ম্যান্ডেলসন দেশ ও দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’

এখন যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, সেটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ব্রিটেনে এপস্টেইন কেলেঙ্কারি এতটা উত্তাপ ছড়াল কেন?

এর ব্যাখ্যায় এপস্টেইন কেলেঙ্কারিকে একটি উছিলা বলা যেতে পারে। লন্ডনে রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি ট্রমায় পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রীরা তাদের মেয়াদ শেষের আগেই পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। দুই বছর আগে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা স্টারমারও হয়তো সেই পরিণতির অপেক্ষায় আছেন। বিশেষ করে হাউস অব কমনসের অধিবেশন দেখাচ্ছে, স্টারমার অনেকটা খাদের কিনারায় পৌঁছে গেছেন। নিজ দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বরাবরই একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে জায়গা থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের দায়িত্ব সামলানোর চাপ বোঝা বেশ কঠিন। কারণ, লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত কালো দরজা দিয়ে যখন কেউ ভেতরে ঢোকেন, তখন থেকেই তাঁর টিকে থাকার ব্যাপ্তি নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। এই উন্মাদনা ও পর্দার পেছনের ষড়যন্ত্র সবসময়ই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের তাড়া করে। গত ১১ বছরের অস্থিরতায় তা আরও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত দেশটি গত কয়েক বছরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় নিতে দেখেছে।

স্টারমারের ক্ষেত্রে যাকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তিনি একেবারেই নগণ্য কেউ নন। ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবের প্রশংসা করতে অনেক সময় ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ বলে সম্বোধন করা হয়। বিশেষ করে লেবার পার্টিতে তাঁর প্রভাব বুঝতে ফিরতে হবে নব্বইয়ের দশকে। দলটি যখন রাজনীতিতে ঝিমিয়ে পড়েছিল, তখন পিটার ম্যান্ডেলসনই টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গে লেবার পার্টিকে চাঙ্গা করেন। মার্গারেট থ্যাচার ও জন মেজরের অধীনে কনজারভেটিভ পার্টির কাছে বিশাল পরাজয়ের পর লেবারকে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন ম্যান্ডেলসন।

কিন্তু এই রোমাঞ্চকর যাত্রাপথে ম্যান্ডেলসনের একটি চারিত্রিক ত্রুটি সামনে আসে- ধনী, বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পাওয়ার আকঙক্ষা। এই ত্রুটিই বারবার কলঙ্কের জন্ম দিয়েছে। একধিকবার তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে এপস্টেইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার দিকে ধাবিত করেছে।

অপরদিকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের চিরন্তন নাটকীয়তায়ও এপস্টেইন ফাইলস নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। কুখ্যাত যৌন নিপীড়কের সঙ্গে এক সময়কার রাজপুত্র অ্যান্ড্রু আলবার্টের সখ্যতা বছরের পর বছর ধরে নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হয়েছে। এপস্টেইনের দ্বারা পাচার হওয়া ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামের নারীর সঙ্গে অ্যান্ড্রুর সমঝোতা হওয়ার বিষয় সামনে এলে অনেক ব্রিটিশ নাগরিক তাদের সহ্যসীমার শেষ বিন্দু অতিক্রম করেন। ফলে রাজপরিবারের সদস্যদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন নিয়েও এখন নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

রাজপরিবারের বিতর্ক ঢাকতে অ্যান্ড্রুর উপাধি কেড়ে নেওয়া ও আবাসস্থল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এখন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় স্টারমারের ভাগ্যে কী ঘটে সেটাই দেখার অপেক্ষা।

-সাইমুন