শর্তের ঘেরাটোপে ইরান, সমঝোতা নিয়ে শঙ্কা

কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তি আলোচনা। কারণ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর তুলে ধরা প্রস্তাবে যেসব শর্ত দেওয়া আছে, তেহরান তা মানতে অস্বীকার করে বসতে পারে। ওমানে শুক্রবার বসতে যাচ্ছে বৈঠকটি। এর মধ্যস্থতা করছে কাতার, তুরস্ক ও মিশর। তারা ইতোমধ্যে আলোচনার একটি নীতিমালা কাঠামো দুই পক্ষের সামনে উপস্থাপন করেছে। প্রস্তাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা থাকায় সমঝোতা না হওয়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বাগযুদ্ধ থেমে নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘খুব চিন্তিত’ থাকা উচিত। ইরানে হামলার জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক বহর সম্পূর্ণ প্রস্তুতও রেখেছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেকোনো হুমকি ও বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

ওমানে আলোচনায় অংশ নেবেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠকের আগে ইতোমধ্যে দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে লাগাম চায় ওয়াশিংটন
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আলোচনার বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন কেবল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপরই নয়, বরং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসর নিয়েও আলোচনা করতে চায়। এছাড়া ‘অঞ্চলজুড়ে সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা’ এবং ‘তাদের নিজস্ব জনগণের সঙ্গে আচরণ’ নিয়েও আলোচনায় চায় ওয়াশিংটন।

হিজবুল্লাহর মহাসচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়াতি বলেছেন, প্রতিরোধের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে অন্যদের প্রতি আগ্রাসনের কোনো অভিপ্রায় ইরানের নেই। তবে যেকোনো হুমকি- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে তেহরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেন, মস্কো শুধু পরস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতি ‘বিস্ফোরক’ আকার নিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা কমানো ও পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি রোধের বিষয়টি এজেন্ডায় থাকা উচিত। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসিপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান বলেন, পরিস্থিতি যাতে এই অঞ্চলকে নতুন সংঘাত এবং বিশৃঙ্খলার দিকে টেনে না নেয়, তুরস্ক এজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনায় সম্মত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা আপাতত নেই।

ট্রাম্পের হুমকি অব্যাহত 
সিএনএন লিখেছে, ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কি চিন্তিত হওয়া উচিত? জবাবে তিনি বলেন, তার খুব চিন্তিত হওয়া উচিত। কারণ এই মুহূর্তে ইরানের দিকে একটি বিশাল সামরিক বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আবারও আক্রমণের কথা বেশ কয়েকবার বলেছে। তিনি বলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দেবেন। শোনা যাচ্ছে, তেহরনায় পুনরায় কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা করেছে। যদি তারা তা করে, তাদের খুবই দুঃখিত হতে হবে। ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন তিনি পাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দিচ্ছে। এ সময় তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে যেতে পারে।

সম্ভাব্য চুক্তির প্রস্তাবে কী আছে 
কাতার, তুরস্ক ও মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা যেসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন তার মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই কার্যক্রম সীমিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে তাতে। আলজাজিরা জানায়, প্রস্তাবিত কাঠামোর মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার ও এই অঞ্চলে ইরানের মিত্রদের অস্ত্র সরবরাহের ওপর বিধিনিষেধ থাকবে। একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রস্তাবগুলোর অধীনে ইরান তিন বছর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে। এই সময়ের পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ১.৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ রাখতে সম্মত হবে। বর্তমানে মজুদ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করতে হবে। মধ্যস্থতাকারীরা প্রস্তাব করেছেন, আঞ্চলিক ও অরাষ্ট্রীয় মিত্রদের কাছে অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর না করার জন্য সম্মত হওয়া উচিত ইরানের। একটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি ‘অ-আগ্রাসন চুক্তির’ কথাও প্রস্তাবে রয়েছে।

ইরানের নতুন ভূগর্ভস্থ মিসাইল ঘাঁটি উন্মোচন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই মাটির নিচে নির্মিত নতুন একটি শক্তিশালী মিসাইল ঘাঁটি উন্মোচন করেছে ইরান। দেশটির চৌকস বাহিনী ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বুধবার এ তথ্য প্রকাশ করে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুল রহমান মৌসাভি এবং বিপ্লবী গার্ডের অ্যারোস্পেস বিভাগের প্রধান সায়েদ মাজেদ মৌসাভি স্বশরীরে ওই ঘাঁটি পরিদর্শন করে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কার মাঝেই তেহরানের এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের প্রতি একটি কঠোর হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ঘাঁটি পরিদর্শনের সময় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আব্দুল রহমান মৌসাভি উল্লেখ করেন, গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরান তাদের সামগ্রিক রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

জ্বালানি ভর্তি দুটি জাহাজ আটক করল ইরান 
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌ বিভাগ ঘোষণা করেছে, তারা উপসাগরের ফারসি দ্বীপের কাছে দুটি ‘জ্বালানি চোরাচালানকারী জাহাজ’ আটক করেছে। তাসনিম নিউজ জানায়, দুটি জাহাজে দশ লাখ লিটারেরও বেশি জ্বালানি পাওয়া গেছে। আটক ১৫ জন বিদেশি ক্রু সদস্যকে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে একটি নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে জাহাজগুলো জ্বালানি চোরাচালান করছিল। আইআরজিসির নৌবাহিনীর নজরদারিতে বিষয়টি ধরা পড়ে। ইরানি বাহিনী নিয়মিতভাবে ট্যাঙ্কারগুলোতে নজরদারি চালিয়ে আসছে।  ইরানের অভিযোগ, তেহরান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী দিয়ে চক্রটি অবৈধ বাণিজ্যে লিপ্ত। সূত্র-আলজাজিরা ও সিএনএন।

-সাইমুন