বাংলাদেশ – ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই নির্বাচন ঘিরে গভীর আগ্রহ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে প্রতিবেশী তিন আঞ্চলিক শক্তি-ভারত, পাকিস্তান ও চীন।
বর্তমানে বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ (জামায়াত)। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে দুই দলই জোরালো প্রচারণা শুরু করেছে।
অন্যদিকে, ঐতিহাসিকভাবে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমনে ভয়াবহ দমন-পীড়নের জন্য দলটির ভূমিকার কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা। ওই সহিংসতায় অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত হন।
৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে রয়েছেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাঁকে অনুপস্থিতিতে বিচার করে গত বছরের নভেম্বরে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তবে ভারত এখনো তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
হাসিনা আসন্ন নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
“বর্জনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকার বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না।”
ভূরাজনীতিতে ‘দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি “প্যারাডাইম শিফট” বা মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের গ্লোবাল স্টাডিজ ও গভর্ন্যান্স বিভাগের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ান আল জাজিরাকে বলেন,
“ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে, বিপরীতে পাকিস্তানের সঙ্গে উষ্ণতা বেড়েছে এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।”
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তিনটি বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত ছিল—
১) ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সর্বাঙ্গীণ সম্পর্ক,
২) পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত অবহেলা ও কূটনৈতিক দূরত্ব,
৩) চীনের সঙ্গে হিসাবি কিন্তু শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও অবকাঠামো অংশীদারত্ব।
“এই পূর্বনির্ধারিত কৌশলগত অবস্থান এখন উল্টে গেছে—ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এবং চীনের ক্ষেত্রে তা নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে,” তিনি যোগ করেন।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক: কী অবস্থানে দাঁড়িয়ে?
শেখ হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখত। ভারত ছিল বাংলাদেশের এশিয়ায় সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে ভারত বাংলাদেশে প্রায় ১১.১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে।
কিন্তু হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্রপথে বাণিজ্যে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কোন দল ক্ষমতায় আছে তার ওপর ভিত্তি করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের উত্থান-পতন ঘটেছে। শেখ হাসিনা দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।
২০২০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন,
“ভারত ও বাংলাদেশ গত পাঁচ-ছয় বছরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেছে।”
তবে বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল দীর্ঘদিন ধরেই হাসিনাকে ভারতের প্রতি “অত্যধিক নরম” থাকার অভিযোগ করে আসছে। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকেছে, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে।হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আরও জোরদার হয়, বিশেষ করে তাঁকে প্রত্যর্পণ না করায়।
ভারতের পক্ষ থেকে আবার অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে।
ভারত এই নির্বাচনকে কীভাবে দেখছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন,
“ভারত চায় এমন একটি সরকার আসুক, যারা দিল্লির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হবে এবং ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থবিরোধী শক্তির প্রভাবমুক্ত থাকবে।”তবে তিনি মনে করেন, সরকারে যেই আসুক না কেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত নয়।
“ভোটের সময় ভারতবিরোধী বক্তব্য জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেই অবস্থান বদলাতে বাধ্য,” বলেন রেজওয়ান।
কুগেলম্যানের মতে, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারত উদ্বিগ্ন হবে, তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে ভারত গ্রহণযোগ্য মনে করবে।
পাকিস্তান–বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন উষ্ণতা
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে।
২০২৪ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দুবার ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৭১ সালের পর প্রথমবারের মতো গত বছর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়। ১৪ বছর পর আবার চালু হয় ঢাকা–ইসলামাবাদ সরাসরি ফ্লাইট।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ভারতের পূর্ব সীমান্তে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
কুগেলম্যান বলেন,
“পাকিস্তানের সবচেয়ে পছন্দের ফল হবে জামায়াতের জয়। তবে বিএনপি এলেও ইসলামাবাদ অসন্তুষ্ট হবে না।”
চীন–বাংলাদেশ সম্পর্ক: যেই আসুক, সম্পর্ক অটুট
চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। শেখ হাসিনার সময় শুরু হওয়া সহযোগিতা ড. ইউনূসের অধীনেও আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার চীনের কাছ থেকে প্রায় ২.১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান নিশ্চিত করেছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায়ও চীন সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রেজওয়ান বলেন,
“চীন বাস্তববাদী। হাসিনার পতনকে তারা সহজভাবে মেনে নিয়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত কাজ শুরু করেছে।”
চীন নির্বাচন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, তবে তাদের কোনো নির্দিষ্ট পছন্দ নেই।
“যেই দলই ক্ষমতায় আসুক, বেইজিং তাদের সঙ্গে কাজ করবে। চীন অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পর্ক পছন্দ করে,” বলেন রেজওয়ান।তিনি যোগ করেন,“চীনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে-বাংলাদেশের নতুন সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ঠেকানো।”
সুত্রঃ আল জাজিরা
বেলাল হোসেন/










