ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৩ আসনটি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলা এবং গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর, ভাউয়ালগর ও পিরুজালী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫,২৭,৩৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৬০,১৯১, নারী ভোটার ২৬৭,১৬২ এবং হিজড়া ভোটার ৭ জন। গাজীপুর-০৩ আসনটি এবার পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে। প্রধান দলের পাশাপাশি ইসলামী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
এই আসনের জন্য মোট ৭ জন প্রার্থী এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এস,এম, রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছেন। মোঃ নাজিম উদ্দিন জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে রয়েছেন। হা: মাও: মুফতি শামীম আহমেদ ইসলামী ঐক্যজোট থেকে মিনার প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছেন। মুহাম্মদ এহসানুল হক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে রিক্সা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন। মোঃ ইজাদুর রহমান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়ছেন।
আশিকুল ইসলাম পিয়াল বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ থেকে মই প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে রয়েছেন। আলমগীর হোসাইন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিচ্ছেন।ইতিপূর্বে দীর্ঘ দিন এ আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। বর্তমানে তাদের নেতারা আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় সাধারণ নেতাকর্মীরা কেউ কেউ বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন। অপরদিকে এ আসনে বিএনপির সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী নিজের নমিনেশন প্রত্যাহার করে নিয়ে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান।
গাজীপুর-৩ আসনকে একটি আধুনিক, মানবিক ও শিক্ষাবান্ধব জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও ভূমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তিনি বলেন, আমি এমন একটি গাজীপুর ৩ গড়তে চাই, যেখানে কোনো মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী বা দুর্নীতিবাজের জায়গা হবে না। ভূমি দখলদারদের কবল থেকে সাধারণ মানুষের জমি উদ্ধার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই জনপদের উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা-ঘাট নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। আমি শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ ও যুগোপযোগী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করব। তিনি জানান, আমি নির্বাচিত হলে প্রতিটি গ্রাম ও ওয়ার্ডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার, ডিজিটাল সেবা সহজীকরণ এবং মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গড়াই হবে আমার অগ্রাধিকার।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বনিদ্বতা করছেন ইজাদুর রহমান মিলন। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রত্যয় নিয়ে তিনি এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ইজাদুর রহমান মিলন বলেন, আমি আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গাজীপুর-৩ আসনের মানুষের সেবা করে যেতে চাই। সে লক্ষ্যেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে আছি। তিনি জানান, গ্রামের সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই তিনি তার রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করবেন। এলাকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সমস্যা ও উন্নয়ন প্রত্যাশাই তার রাজনীতির মূল প্রেরণা। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, দল থেকে বের হয়ে আসার পর তিনি দলীয় সকল কার্যক্রম থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে রেখেছেন এবং বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত নন তিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে তিনি কোনো সাংগঠনিক দায়িত্বে নেই এবং দলীয় কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন না।
১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত মাওলানা এহসানুল হক বলেন, আমি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচনে এসেছি। রিকশা যেমন সাধারণ মানুষের বাহন, তেমনি আমার রাজনীতি সাধারণ মানুষের কথা বলার রাজনীতি। আমি চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে দুর্নীতি,দুঃশাসন ও বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় গাজীপুর ৩ আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জয় ছিল নিয়মিত ঘটনা। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে দলটির নেতাকর্মীরা অনেকটাই আত্মত্মগোপনে চলে যান। এর ফলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় এককভাবে বিএনপির হাতে চলে আসে।
একই সময়ে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলেও জোটের আসন ভাগাভাগিতে বঞ্চিত হওয়ায় তাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ, জোটের হিসাব-নিকাশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সক্রিয়তায় গাজীপুর ৩ আসনের নির্বাচন এবার বেশ জমজমাট হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মাহমুদুল হাসান, শ্রীপুর গাজীপুর










