ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আহত বহু মানুষ গ্রেপ্তার ও নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কায় সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে চাইছেন না। বরং তাঁরা গোপনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
ইস্পাহান শহরের এক বিক্ষোভকারী ‘তারা’ (ছদ্মনাম) বিবিসিকে জানান, বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিনি ও তাঁর বন্ধু আহত হন। স্থানীয় লোকজন সাহায্য করলেও তিনি বারবার অনুরোধ করেন যেন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া না হয়। তাঁর ভাষায়, “হাসপাতালে গেলে গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় ছিল।”
আহত অবস্থায় তাঁরা এক দম্পতির বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে পরিচিত এক চিকিৎসক গোপনে তাঁদের চিকিৎসা করেন এবং শরীর থেকে গুলির কিছু অংশ বের করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করে জানান, সব বুলেটের অংশ অপসারণ সম্ভব নয়।
ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্য সংগ্রহে বাধা
সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) দাবি করেছে, বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার ৩০১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫ হাজার ৯২৫ জন বিক্ষোভকারী, ১১২ জন শিশু ও ৫০ জন সাধারণ পথচারী। নিরাপত্তা বাহিনীর নিহত সদস্যের সংখ্যা ২১৪। এ ছাড়া ১১ হাজারের বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান সরকার জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা তিন হাজারের কিছু বেশি এবং তাঁদের বড় অংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।
হাসপাতালেও নিরাপত্তা নজরদারি
আহত বিক্ষোভকারী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বিবিসিকে জানান, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি রয়েছে। রোগীদের পরিচয় ও মেডিক্যাল নথিপত্র নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তেহরানের এক সার্জন ‘নিমা’ (ছদ্মনাম) জানান, ৮ জানুয়ারি তিনি রাস্তায় রক্তাক্ত তরুণদের পড়ে থাকতে দেখেন। পুলিশের তল্লাশি এড়াতে তিনি একজন আহতকে গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁর ভাষায়, “প্রায় ৯৬ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে আমরা একটানা অস্ত্রোপচার করেছি।”
তিনি বলেন, অনেক রোগীর হাত-পা ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে গুরুতর গুলিবিদ্ধ ক্ষত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অঙ্গচ্ছেদ ছাড়া উপায় ছিল না।
গ্রেপ্তার আতঙ্কে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত
তেহরানের এক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির কারণে অনেক সময় চিকিৎসকেরা রোগীর আঘাতের প্রকৃত তথ্য নথিতে উল্লেখ করতে পারছেন না।
এক আহত বিক্ষোভকারীর ভাই ‘সিনা’ (ছদ্মনাম) বলেন, হাসপাতালে গিয়ে তাঁদের পরিচয়পত্র নম্বর দিতে বাধ্য করা হয়। এতে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁর আশঙ্কা, “যেকোনো সময় নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের বাড়িতে হানা দিতে পারে।”
বিবিসির হাতে আসা তথ্যে জানা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকেই রোগীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পরে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকরাও ঝুঁকিতে
মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার কারণে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও এখন নিরাপত্তা বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক ও একজন স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সম্প্রতি কাজভিন শহরের সার্জন ড. আলিরেজা গোলচিনিকে আহত বিক্ষোভকারীদের চিকিৎসা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ‘খোদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’র অভিযোগ আনা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
সূত্রঃ বিবিসি
বেলাল হোসেন/










