বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন সেনাবাহিনী কি এখনও নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব রাখছে?
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক অভ্যুত্থান ও সরাসরি সেনাশাসনের যুগ আপাতত অতীত হলেও, দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন, যে আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
নির্বাচনী পরিবেশে সেনাবাহিনীর ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাসদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ভোটের পরিবেশে বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর পুলিশ বাহিনী এখনও পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরেই সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে রয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশে প্রায় এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত নির্বাচন বিধিমালায় সেনাবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান বলেন, “সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তী সরকারকে শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, দৈনন্দিন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও সহায়তা করছে। সেনাবাহিনীর আগ্রহ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।”
সরাসরি ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা কম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহান বলেন, সেনাবাহিনীর সরাসরি ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা খুবই কম, যদি না চরম আইনশৃঙ্খলা ভাঙন ঘটে এবং জনসাধারণ সেনাবাহিনীকে ‘শেষ ভরসা’ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও লেখক রাজিব হোসেন বলেন, “গত দেড় বছরে সেনাবাহিনীর কোনো দলীয় পক্ষপাতমূলক ভূমিকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাহিনীর ভেতরেও এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা আছে-নিরপেক্ষতা হারালে তারা জনগণের আস্থা হারাবে।”
২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ও সেনাবাহিনী
২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল নির্ধারক। বিক্ষোভ চলাকালে সেনাবাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শেখ হাসিনাকে দেশত্যাগের সুযোগ দেয়। এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
তবে পরে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে সেনাপ্রধানের মন্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমালোচকদের মতে, এতে সেনাবাহিনী ও রাজনীতির সীমারেখা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
অতীতের ছায়া এখনও রয়ে গেছে
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের পর একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও সেনাশাসন দেশটির রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল সেই সময়ের স্মারক।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে নিরাপত্তা বাহিনী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে একাধিক সংস্থার তদন্ত চলছে। বর্তমানে ১৫ জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বেসামরিক আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলছে, যা বাংলাদেশে নজিরবিহীন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিচার প্রক্রিয়া সেনা-বেসামরিক সম্পর্কের জন্য সংবেদনশীল হলেও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের ভূমিকা যেন রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
থমাস কিয়ান বলেন, “গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে শুধু সেনাবাহিনী নয়, বেসামরিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও সংযম দেখাতে হবে। রাজনীতিবিদরা যদি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করেন, তবেই সেনাবাহিনী ব্যারাকে থাকবে।”
সূত্রঃ আল জাজিরা
বেলাল হোসেন/










