সিলেট প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। আছেন অনেক প্রবাসী প্রার্থীও। নির্বাচন এলেই যারা প্রবাসী নন তারাও প্রবাসনির্ভর হয়ে পড়েন। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জেলায় ৩৪ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৯ জন নির্বাচন করছেন নিজের টাকায়!
নির্বাচনে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক শক্তির চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে প্রবাসী অর্থের জোগান। নিজের আয় নয়, প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের দান ও ধারের ভরসাতে নির্বাচন করছেন সিলেটের দুই-তৃতীয়াংশ প্রার্থী।
সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের ব্যয়ের উৎস ঘেঁটে এটা স্পষ্ট, বিদেশ থেকে আসা অর্থ ছাড়া অনেক প্রার্থীর নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় থাকা কঠিন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, সিলেটের ছয়টি আসনে মোট ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে ২৫ জনই জানিয়েছেন, নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থ তারা মেটাবেন দান ও ধার থেকে। মাত্র নয়জন প্রার্থী দাবি করেছেন যে তারা পুরোপুরি নিজস্ব আয়ের টাকায় নির্বাচন করবেন। এসব দান ও ধার প্রদানকারীদের বড় অংশই প্রবাসী স্বজন কিংবা প্রবাসে থাকা শুভানুধ্যায়ী। ছয়টি আসনের অন্তত ১৭ জন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।
বিশিষ্ট আইনবিদ ও বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, প্রবাসী স্বজনরা প্রার্থীদের সহযোগিতা করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রার্থীরা যেহেতু প্রবাসী অর্থের কথা বলেছেন সেক্ষেত্রে সেসব অর্থ বৈধভাবে আসছে কি না তা খতিয়ে দেখা নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
নির্বাচনী ব্যয়ে প্রবাস নির্ভরতার চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে।
বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে নিজের আয় থেকে দেবেন মাত্র ১৫ লাখ টাকা। বাকি অর্থের বড় অংশই আসছে প্রবাস থেকে। ফ্রান্স প্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী একাই দিচ্ছেন ৩৫ লাখ টাকা। এছাড়া ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী দুই চাচাতো ভাই এবং দেশে থাকা এক খালাতো বোন দিচ্ছেন আরও ১৫ লাখ টাকা।
একই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুন নূর ২৫ লাখ টাকার মধ্যে ২২ লাখ টাকা পাচ্ছেন প্রবাসী আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে দান হিসেবে। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম ২৪ লাখ টাকার ব্যয়ের মধ্যে ভাইয়ের প্রবাসী আয়ের ২০ লাখ টাকা পাচ্ছেন দান হিসেবে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ২৪ লাখ ১৩ হাজার টাকার ব্যয়ের মধ্যে সাড়ে আট লাখ টাকা অন্যের দান হিসেবে দেখিয়েছেন। তবে এই আসনে ব্যতিক্রম হিসেবে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান জানিয়েছেন, তার ২৫ লাখ টাকার পুরো নির্বাচনি ব্যয় নিজস্ব আয়ের অর্থ থেকেই আসবে।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনেও অন্যের টাকায় নির্বাচনের প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন ২৫ লাখ টাকা। হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, এই পুরো অর্থই দেবেন তার চিকিৎসক ভাই ডা. কাওছার রশীদ।
বিএনপির সমর্থন পাওয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুক ১২ লাখ টাকার মধ্যে নিজ আয়ের মাত্র দুই লাখ টাকা ব্যয় করবেন। বাকি অর্থ প্রবাসী স্বজনদের কাছ থেকে ধার ও দান হিসেবে পাবেন। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল হাসান নিজ আয়ের তিন লাখ টাকার পাশাপাশি প্রবাসী শ্যালকের দেওয়া পাঁচ লাখ এবং নয়জন শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে পাওয়া দানের টাকা ব্যয় করবেন, যার বড় অংশই প্রবাসীদের দেওয়া।
এই আসনে কেবল বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রার্থী মো. বিলাল উদ্দিন নিজ আয়ের পাঁচ লাখ টাকায় নির্বাচন করবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে আটজন প্রার্থীর মধ্যে অধিকাংশই দান ও ধারনির্ভর। বিএনপির প্রার্থী ও শিল্পপতি খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের ঘোষণা দিলেও নিজের আয় থেকে দেবেন ২৫ লাখ টাকা। বাকি অর্থ আসবে স্ত্রী, ভগিনীপতি ও ভাগনের কাছ থেকে দান হিসেবে।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী মো. শামীম মিয়া ব্যবসা ও ব্যাংক সুদের আয় থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি প্রবাস থেকে পাওয়া ১১ লাখ এবং আরও ১২ জনের কাছ থেকে পাওয়া ১০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান নিজ আয়ের এক লাখ ২০ হাজার টাকার সঙ্গে প্রবাসী চাচার দেওয়া দুই লাখ ৯০ হাজার এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের দানের অর্থ ব্যয় করবেন।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিজ আয়ের এক লাখ টাকার পাশাপাশি প্রবাসী স্বজনদের দেওয়া তিন লাখ এবং দলীয় সমর্থকদের দেওয়া অর্থ ব্যয় করবেন।
ব্যতিক্রম হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাবিবুর রহমান পুরো ৩০ লাখ টাকা নিজ আয়ে ব্যয় করবেন।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে পাঁচজন প্রার্থীর সবাই প্রবাসী টাকার ওপর নির্ভরশীল। বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা ২০ লাখ টাকার ব্যয়ের মধ্যে নিজ আয় থেকে দেবেন পাঁচ লাখ টাকা। বাকি অর্থের বড় অংশ পাচ্ছেন দুই প্রবাসীর কাছ থেকে।
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাছির আলী ২৫ লাখ টাকার ব্যয়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি পাচ্ছেন প্রবাসী দান ও ধার থেকে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ১১ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখই পাচ্ছেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী ছেলের কাছ থেকে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. আমির উদ্দিন ও গণফোরামের প্রার্থী মো. মুজিবুল হকের ব্যয়ের হিসাবেও প্রবাসী অর্থের বড় ভূমিকা রয়েছে।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুসলেহ উদ্দীন রাজু, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আতিকুর রহমান পুরোপুরি নিজ আয়ে নির্বাচন করলেও বিএনপির প্রার্থী এমএ মালিক, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রেদওয়ানুল হক চৌধুরী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকের প্রবাসী টাকার ওপর নির্ভরশীল।
মইনুল বাকের প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের দান, ধার এবং জমি বিক্রির অর্থ মিলিয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখিয়েছেন।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম নিজ আয়ের অর্থে নির্বাচন করলেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সাঈদ আহমদ ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. জয়নাল আবেদীনের ব্যয়ে প্রবাসী দানের অংশ রয়েছে।
সব মিলিয়ে সিলেটের নির্বাচনি মাঠে এবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে প্রবাসী অর্থ শুধু সহায়ক নয়, অনেক প্রার্থীর জন্য তা নির্বাচনে টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন।
-সাইমুন










