“বিছানার চাদর ছিল রক্তমাখা, স্যাঁতসেঁতে মেঝের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠের দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ছিল মোবাইল নম্বর।” আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে এভাবেই তথাকথিত ‘আয়নাঘর’ বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারের (জেআইসি) বীভৎস বর্ণনা দিচ্ছিলেন গুমের শিকার সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান। রোববার (২৫ জানুয়ারি) জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় দিনের সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি প্রদান করেন।
জবানবন্দিতে হাসিনুর রহমান জানান, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট রাতে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আবদুল্লাহর পীড়াপীড়িতে তিনি ঘুরতে বের হন। রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরার পথে ৮-১০ জন লোক তাঁকে ঘিরে ধরে। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনে থাকা তাঁর বন্ধু যায়িদ রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান। নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়ে অপহরণকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। একপর্যায়ে পাঁচটি মাইক্রোবাসে আসা একদল লোক তাঁকে এবং তাঁর শ্যালিকার বাসার কেয়ারটেকার মুক্তারকে তুলে নিয়ে যায়।
হাসিনুর রহমান জানান, তাঁকে হাতকড়া ও চোখে কালো কাপড় বেঁধে প্রায় ২০-২৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৮/১০ ফুটের একটি অত্যন্ত নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে কক্ষে তাঁকে রাখা হয়। তিনি বলেন, “কক্ষটিতে সারাক্ষণ হাইভোল্টেজের বাতি জ্বলে থাকত। দেয়াল ও বিছানা ছিল রক্তমাখা। সেখানে প্রচণ্ড গরমে আমি অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।”
জবানবন্দিতে হাসিনুর বলেন, তাঁকে চোখ বেঁধে একটি এসি রুমে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে কোনো একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা তাঁকে জেরা করছিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল— কেন তিনি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, আওয়ামী লীগ এবং ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক লেখালেখি করেন। কেন তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন। তাঁকে মেরে ফেলা এবং লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়। হাসিনুর জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় কেউ একজন তাঁকে বলেছিলেন, “আপনি আয়নাঘরে আছেন।” এরপর তাঁকে ইলেকট্রিক শকসহ অকথ্য শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। রোববার সকালে বিশেষ কারাগার থেকে গ্রেপ্তারকৃত ৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মামলার ১০ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই সাবেক ডিজিএফআই প্রধান।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। হাসিনুর রহমানের জবানবন্দি এখনো শেষ হয়নি; বিরতির পর অবশিষ্ট অংশ শোনা হবে।