যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধের এক বছর পরও ত্রাণ-সংকটে টিগ্রে

“হিটসাটসে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রতীক্ষায় প্রত্যাশী গ্রামবাসীরা যার সঙ্গে বাড়ছে হতাশা।” (ছবি: সামুয়েল গেটাচু/আল জাজিরা)

যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা বন্ধের এক বছর পেরিয়ে গেলেও ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টিগ্রে অঞ্চলে সংকটের কোনো উপশম নেই। ক্ষুধা, অপুষ্টি ও চিকিৎসা সংকটে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। ৮৮ বছর বয়সী নিরেয়াও উবেত এখন প্রায় প্রতিদিনই বন্ধু ও স্বজনদের দাফন করছেন। তার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা নিজের সময় এলে তাকে কবর দেওয়ার মতো কেউ থাকবে তো?

এরিত্রিয়া সীমান্তের কাছে হিটসাটস গ্রামে বসবাসকারী উবেত বলেন, “মানবিক সহায়তা খুবই সামান্য। যুদ্ধ নয়, শেষ পর্যন্ত আমাদের মেরে ফেলবে দুর্ভিক্ষ।” একসময়ের সফল কৃষক উবেত ২০২০ সালে শুরু হওয়া টিগ্রে যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয়ে চার বছর আগে এখানে আশ্রয় নেন। ২০২২ সালে সংঘাত শেষ হলেও তিনি আর নিজের জীবনে ফিরতে পারেননি। খবর আলজাজিরার।

হিটসাটস মূলত মানবিক সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড) একসময় ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বড় দাতা ছিল। কিন্তু এক বছর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ইউএসএইডের কার্যক্রম ও অর্থায়ন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়—এর সরাসরি প্রভাব পড়ে টিগ্রেতে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলছে, টিগ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জরুরি সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় আছে। তবে ইউএসএইডের তহবিল বন্ধ হওয়ায় সামগ্রিক মানবিক অর্থায়ন কমে গেছে; যে অল্প সহায়তা আছে, তা আরও ‘জরুরি’ বৈশ্বিক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় চলে যাচ্ছে। চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাটছাঁট বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য ও মানবিক কর্মসূচি ‘উল্টে দিয়েছে’ এর মানবিক মূল্য ‘ভয়াবহ’।

এমএসএফ জানায়, সোমালিয়ায় থেরাপিউটিক দুধের সরবরাহ বন্ধ থাকায় শিশুপুষ্টিহীনতা বেড়েছে; দক্ষিণ সুদানের রেঙ্কে অর্থায়ন কমে মাতৃসেবায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে; কঙ্গোতে ইউএসএইড ভেঙে দেওয়ায় ১ লাখ ধর্ষণ–পরবর্তী চিকিৎসা কিট বাতিল হয়েছে। ইথিওপিয়ায় যা একসময় সাব-সাহারান আফ্রিকায় ইউএসএইডের সবচেয়ে বড় গ্রহীতা ছিল এই ঘাটতি অন্য সংস্থাগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।

এমএসএফের ইথিওপিয়া মিশন প্রধান জোশুয়া একলি বলেন, “দাতা সংস্থার কাটছাঁটে ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও চাপে পড়েছে। চিকিৎসা, পানি ও স্যানিটেশনে প্রবেশাধিকার কমছে কিন্তু চাহিদা সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।”

‘হ্রদের মধ্যে এক গ্লাস পানি’

হিটসাটসে ২০২২ থেকে বসবাসকারী ৭১ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত তেরফুনেহ ওয়েলদেরুফায়েল বলেন, গত এক বছরে ক্ষুধায় স্বজন হারাননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই কঠিন। সরকারি আইডিপি ক্যাম্পের সমন্বয়ক আব্রাহা মেব্রাতু জানান, সহায়তা প্রায় নেই বললেই চলে; মৃত্যুর সংখ্যা এত বেশি যে আর হিসাবও রাখা হচ্ছে না। “জমি অনাবাদি, খাবার উৎপাদনের সুযোগ নেই অনেকে কেবল মৃত্যুর অপেক্ষায়,” বলেন তিনি। অনেক স্থানীয় ত্রাণকর্মীও এক বছর ধরে বেতন পাননি; তারাও অনাহারে।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে কাছের শায়ারে ডব্লিউএফপি অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যা ইউএসএইড-সংক্রান্ত বাজেট কাটের ফল। পরে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সহায়তা পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিলেও টিগ্রেতে তার প্রভাব সামান্য। মেব্রাতুর ভাষায়, “প্রায় দুই হাজার মানুষের জরুরি চাহিদার বিপরীতে যা আসছে, তা হ্রদের মধ্যে এক গ্লাস পানি ঢালার মতো।”

সরকারি অস্বীকার ও নাগরিক উদ্যোগে বাধা

ইউএসএইডের অনুপস্থিতিতে কিছু নাগরিক ও অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার তহবিল তুলতে উদ্যোগ নিলেও কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দেয়। সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র দুর্ভিক্ষের কথা স্বীকার করেনি। সমালোচকদের মতে, দেশকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ দেখানোর চেষ্টাই প্রাধান্য পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ২০২৪ সালে সংসদে বলেছিলেন, “ইথিওপিয়ায় ক্ষুধায় কেউ মারা যাচ্ছে না।” অথচ ডব্লিউএফপি জানায়, তখন ১ কোটির বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে। সর্বশেষ ফ্যামিন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমস নেটওয়ার্কের মতে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এখন ১ কোটি ৫০ লাখের বেশি ইথিওপিয়ান জরুরি খাদ্য সহায়তার প্রয়োজন।

ফেডারেল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিশন টিগ্রেতে ব্যাপক অনাহারের অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিকাংশ এলাকায় সহায়তা কমাতে বাধ্য হয়েছে তারা। এদিকে সরকার জ্বালানি ও টেলিযোগাযোগে নতুন কর চালুর ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় উদ্যোগে দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে তহবিল জোগাড়ের লক্ষ্যে।

কবরস্থানে জায়গা ফুরোচ্ছে

৭১ বছর বয়সী আলমাজ গেব্রেজেদেল হিটসাটসে সামান্য সহায়তার খোঁজে ঘুরে বেড়ান। পাশের তাঁবুতে অসুস্থ ও অনাহারে শয্যাশায়ী মার্তা তাদেসে এইচআইভি আক্রান্ত ৬৭ বছরের বিধবা বলছেন, ওষুধ বন্ধ, খাবারই এখন সবচেয়ে বড় চাহিদা। গির্জার ডিকন ইয়োনাস হাগোস জানান, “ক্ষুধায় মৃত্যুর কারণে কবরস্থানের জায়গা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।”

-সাবরিনা রিমি