জীবনভর রুপালি পর্দায় নানা চরিত্রে ভেসে ভেসে ‘অনন্ত প্রেম’ সিনেমার এই নায়কও অনন্তের পথে চলে গেলেও, কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে তার দ্বীপ নেভে নাই। ৮৪ বছর আগে আজকের দিনে তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। চলচ্চিত্রের অগ্রজ ও অনুজের কাছে রাজ্জাক নামটি গর্ব আর অনুপ্রেরণার।
বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্যমণি ও কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিন আজ। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। রোমান্টিক নায়ক হয়ে কখনো নীল আকাশের নিচে হেঁটেছেন, আবার কখনো তাকে পর্দায় দেখা গেছে পিতার বেশে আবার কখনো সংগ্রামী যোদ্ধারূপেও দর্শক দেখেছেন তাদের প্রিয় নায়ক কে।
জন্মদিনের দিনটি ঘিরে বিশেষ কোনো আয়োজন থাকছে না বলে জানিয়েছেন প্রয়াত রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যরা। বড় ছেলে বাপ্পা রাজ জানান, তার বাবার কবর জিয়ারত, কোরআন তেলাওয়াত ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে জন্মদিন পালন করবেন তারা।
এদিকে, নায়করাজ নামে পরিচিত হলেও তার পরিবারিক নাম আবদুর রাজ্জাক। ১৯৬৪ সালে কলকাতা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন তিনি।
রাজ্জাকের চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। নায়ক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ হয় জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে সুচন্দার বিপরীতে। তারপর থেকে একাধারে অভিনয়, প্রযোজনা ও পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রাঙ্গন দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।
‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ছুটির ঘণ্টা’সহ মোট ৩০০টির বেশি বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সঙ্গে ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন তিনি।
তিনি পরিচালনা করেছেন ১৬টি চলচ্চিত্র। গড়ে তোলেন রাজলক্ষী প্রোডাকশন হাউজ। প্রযোজক হিসেবে তার যাত্রা হয় ‘রংবাজ’ সিনেমার মাধ্যমে। এরপর বেশ কিছু সিনেমা প্রযোজনাও করেছেন এই কিংবদন্তি।
তিনি ১৯৬২ সালে খায়রুন নেসার (লক্ষ্মী) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেন রেজাউল করিম (বাপ্পারাজ), খালিদ হোসেইন (সম্রাট), নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসেন বাপ্পি, আফরিন আলম ময়না।
দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে নায়করাজ ২০১৫ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ পুরস্কারে ভূষিত হন। শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন মোট পাঁচবার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান ২০১৩ সালে। এছাড়াও বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের এ অবিসংবাদিত রাজা।
এখনো দর্শকদের ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘মাগো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দেওয়ানা’, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ সংসারে’, ‘এই পৃথিবীর পরে কতো ফুল ফোটে আর ঝরে’ (যদিও গানটি ছিল নায়িকা ববিতার লিপে), ‘আউল বাউল লালনের দেশে’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার’, ‘মাস্টারসাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়ে আমি যাবো’ সহ বহু গান নায়ক রাজ্জাকে মনে করায়।
কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে তিনি প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু সিনেমায় অভিনয় করেছেন। পরিচালনাও করেছেন বেশ কিছু সিনেমা। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ঢাকায় ভারতীয় ছবি আসা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলা সিনেমার এখানকার দর্শক সেদিন উত্তম-সুচিত্রা জুটির পর রাজ্জাক-সুচন্দা জুটিকেই সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। সুচন্দার সঙ্গে রাজ্জাকের দর্শকনন্দিত সিনেমাÑ‘আনোয়ারা’, ‘দুই ভাই’, ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’, ‘কুচবরণ কন্যা’, ‘মনের মত বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘সংসার’সহ আরও কিছু সাড়া জাগানো ছবি।
মাহমুদ সালেহীন খান










