আমরা না থাকলে ইউরোপের সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলতো: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে ইউরোপকে উদ্ধার করেছিল। তিনি বলেন, “আমরা না থাকলে আপনারা সবাই এখন জার্মান ভাষায় কথা বলতেন” বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় নেতাদের তীব্র কটাক্ষ করে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা না থাকলে আজ পুরো ইউরোপের মানুষ ‘জার্মান এবং কিছুটা জাপানি’ ভাষায় কথা বলত।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের দাবিতে অনড় থেকে তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের পর গ্রিনল্যান্ড ফেরত দেওয়া ওয়াশিংটনের একটি ‘বোকামি’ ছিল।

ট্রাম্প ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ নিজেদের মালিকানায় নেওয়ার ওপর জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়া ও চীনের মোকাবিলায় উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য এই ‘বিশাল বরফের টুকরোটি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে উত্তেজনার মধ্যেই তিনি স্পষ্ট করেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবেন না, যদিও তিনি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ‘অপ্রতিরোধ্য’। ডেইলি মেইল ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিস্তারিত উঠে এসেছে।

ট্রাম্প তার দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক ভাষণে অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চরম ‘অকৃতজ্ঞ’। তিনি দাবি করেন, তার হস্তক্ষেপের কারণেই বর্তমানে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো সামরিক বাজেটে তাদের জিডিপি-র ৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করছে, যা আগে প্রায় পুরোটাই যুক্তরাষ্ট্রকে বহন করতে হতো।

ডেনমার্কের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশটি গ্রিনল্যান্ডের প্রতিরক্ষা জোরদারে ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচের প্রতিশ্রুতি দিলেও তার ১ শতাংশও ব্যয় করেনি। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি অন্তত চারবার গ্রিনল্যান্ডকে ভুল করে ‘আইসল্যান্ড’ বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন যে ‘আইসল্যান্ড’ ইস্যুতে শেয়ার বাজারে ধস নামায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। এছাড়া তিনি আবারও তার প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রিনল্যান্ডে স্থাপনের পরিকল্পনা পুনর্ব্যক্ত করেন।

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্প কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত গণঅভিবাসনের’ কারণে ইউরোপের অনেক জায়গা এখন চেনার উপায় নেই। তিনি দাবি করেন যে ইউরোপ বর্তমানে ভুল পথে হাঁটছে এবং তারা নিজেদের সংস্কৃতি ধ্বংস করছে। বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতিকে তিনি ‘অলৌকিক’ বলে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন যে তার শাসনামলে মূল্যস্ফীতি পরাজিত হয়েছে।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, উত্তর সাগরের বিশাল তেলের খনি ওপর বসে থেকেও ব্রিটেন ১৯৯৯ সালের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি উৎপাদন করছে, যা দেশটির বর্তমান উচ্চ মূল্যের কারণ। ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার প্রস্তাবে তারা রাজি হলে যুক্তরাষ্ট্র কৃতজ্ঞ থাকবে, অন্যথায় ওয়াশিংটন বিষয়টি ‘মনে রাখবে’।

ট্রাম্পের এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত ঘোষণা করেছে। জার্মান এমপি বার্নড ল্যাঞ্জ জানিয়েছেন, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।

অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার এবং চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস জানিয়েছেন, শুল্ক আরোপের হুমকিতে ব্রিটেন তার নীতি ও মূল্যবোধ থেকে সরে আসবে না। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের ওপর চাপ প্রয়োগকে সম্পূর্ণ ভুল বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের মিত্র দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সূত্র: ডেইলি মেইল

-মামুন