ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ চান সন্দ্বীপবাসী

সন্দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি দ্বীপ। ধারণা করা হয়, এর বয়স প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার বছর। চারদিকে নদী ও সাগরঘেরা এ দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। উত্তরে বামনি নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেল হয়ে ফেনী নদীর মোহনা এবং পশ্চিমে মেঘনা নদীর মোহনা সন্দ্বীপকে ঘিরে রেখেছে। এই মোহনার পূর্বে সন্দ্বীপ ও পশ্চিমে হাতিয়া দ্বীপ অবস্থিত।

একশ বছর আগেও হাতিয়া ও সন্দ্বীপ ছিল প্রায় পাশাপাশি। স্থানীয়দের ভাষায়, তখন ভোর রাতে এক পাড়ের মোরগের ডাক অন্য পাড় থেকে শোনা যেত। অথচ বর্তমানে এই দুই দ্বীপের দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার, যার প্রায় পুরোটাই সন্দ্বীপের নদীভাঙনের ফল।

ভয়াবহ নদীভাঙন ও মানবিক বিপর্যয়

মেঘনা মোহনার ভয়াবহ ভাঙনে সন্দ্বীপের পশ্চিমাংশের বিশাল এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে দ্বীপটির প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ মানুষ বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়েছেন। বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। নদীভাঙনে শুধু ঘরবাড়ি নয়, হারিয়ে গেছে চাষাবাদের জমিও।

ভূমির সংকটে মানুষ বাধ্য হয়ে খাল, বিল ও কৃষিজ জমিতে বসতি গড়ে তুলছে। ফলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন কমে এসেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। এর ফলে শাক-সবজি, মাছ, মাংস, ডিম ও দুধের জন্য সন্দ্বীপকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়ের কারণে এসব পণ্যের দামও তুলনামূলক বেশি, যা দীর্ঘদিন ধরে সন্দ্বীপবাসীর অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৬০ মৌজার ঐতিহাসিক সন্দ্বীপ

একসময় প্রায় ১ হাজার ৩ বর্গমাইল আয়তনের সন্দ্বীপে ছিল ৬০টি মৌজা। নদীভাঙনে এর বড় অংশ হারিয়ে গেছে। এসব মৌজার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ন্যায়ামস্তি, মুছাপুর, গাছুয়া, বাউরিয়া, হারামিয়া, সারিকাইত, সাতঘরিয়া, চৌকাতলীসহ আরও অনেক এলাকা।

ভাসানচর ও মালিকানা বিতর্ক

সন্দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, সাবেক ন্যায়ামস্তি ইউনিয়নের এলাকায় ১৯৮০–১৯৯০-এর দশকে একটি নতুন চর জেগে ওঠে। আজ সেটিই পরিচিত ভাসানচর নামে, যেখানে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ভাসানচর সন্দ্বীপের অংশ হলেও একটি প্রভাবশালী মহলের সিদ্ধান্তে এটিকে হাতিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ করেন সন্দ্বীপবাসী। গুগল ম্যাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মানচিত্রেও ভাসানচরকে সন্দ্বীপের নিকটবর্তী দেখানো হচ্ছে, যা সন্দ্বীপবাসীর দাবিকে আরও জোরালো করে।

অধিকার আন্দোলন ও আইনি লড়াই

ভাসানচরসহ হারানো ভূমি ফিরে পেতে ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারি সন্দ্বীপের এনাম নাহার মোড়ে প্রথম মানবাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়। সমাজকর্মী অধ্যক্ষ মুক্তাদের আজাদ খান ও সন্দ্বীপ অধিকার আন্দোলনের সভাপতি হাসানুজ্জামান সন্দ্বীপির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে দ্বীপের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান মনিরুল হুদা বাবন “চট্টগ্রাম–নোয়াখালী জেলা সীমানা নির্ধারণ” চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন (রিট নং ৭০৯৮/১৮)। এ আইনি লড়াইয়ে সন্দ্বীপের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

আদালতের নির্দেশনা ও সীমানা নির্ধারণ

হাইকোর্টের নির্দেশে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ১৯৩৫ ও ১৯৫৪ সালের সিএস নকশা, অক্ষাংশ–দ্রাঘিমাংশ ও জিওরেফারেন্সিং পদ্ধতি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সীমানা নির্ধারণ করে। এতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ভাসানচর সন্দ্বীপের সীমানার মধ্যেই অবস্থান করছে।

গত ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান এ সংক্রান্ত নকশায় স্বাক্ষর করেন।

সন্দ্বীপবাসীর দাবি

সন্দ্বীপের মানুষ এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছে একটাই দাবি জানাচ্ছেন ভাসানচরসহ সন্দ্বীপের ৬০ মৌজা দ্রুত চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার নামে গেজেট প্রকাশ করা হোক।

এই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্দ্বীপ আসনের প্রার্থীরাও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা, জামায়াতে ইসলামীর আলাউদ্দিন শিকদার এবং ইসলামী আন্দোলনের মো. আমজাদ হোসেন।

দীর্ঘ নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি ও প্রশাসনিক জটিলতার পর সন্দ্বীপবাসী এখন ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় তাকিয়ে আছে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের দিকে।

-আবু সাঈদ খান, সন্দ্বীপ