ডাইনোসরদের রাজার আয়ু কত ছিল, নতুন গবেষণায় হিসাব বদল

নতুন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডাইনোসরদের রাজা হিসেবে পরিচিত টাইরানোসরাস রেক্স (টি-রেক্স) সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকত। তবে তাদের জীবনকাল সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। নতুন এই গবেষণা বলছে, টি-রেক্সদের গড় আয়ু এত দিন যা মনে করা হতো, তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
টি-রেক্স ছিল নিজেদের সময়ের সবচেয়ে হিংস্র ও ক্ষমতাধর শিকারি ডাইনোসরদের অন্যতম। শিকারি হিসেবে দক্ষতা, বিশাল আকার এবং ভয়ংকর চেহারার কারণে তারা অন্য প্রাণীদের কাছে কার্যত ‘রাজা’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও বিশেষ করে ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে টি-রেক্স বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়।গত কয়েক দশকের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, টি-রেক্স সাধারণত ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকত।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানাটমির অধ্যাপক হলি উডওয়ার্ড ও তার গবেষক দল বলছে, বাস্তবে এই ডাইনোসরদের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ বছর।গাছের কাণ্ডের বলয় দেখে যেমন গাছের বয়স নির্ধারণ করা যায়, ঠিক তেমনভাবেই টি-রেক্সের পায়ের হাড়েও বয়সের ছাপ থাকে। এই হাড়ে থাকা বলয় বিশ্লেষণ করেই বয়স নির্ধারণ করেন গবেষকেরা।উডওয়ার্ডের নেতৃত্বে গবেষক দল টি-রেক্সের ১৭টি জীবাশ্মের হাড় বিশ্লেষণ করেন। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষ ধরনের আলো ব্যবহার করে তারা এমন কিছু বলয় শনাক্ত করেন, যা আগের গবেষণায় চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
এই ‘অদৃশ্য’ বলয়গুলোর কারণেই এত দিন টি-রেক্সের প্রকৃত আয়ু কম ধরে নেওয়া হয়েছিল।সম্প্রতি পিয়ারজে জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, টি-রেক্সরা ৩৫–৪০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকত এবং সেই বয়সে পৌঁছানোর আগে তাদের ওজন ৮ টনের কাছাকাছি হতো।গবেষণায় টি-রেক্সদের শারীরিক বিকাশ সম্পর্কেও নতুন তথ্য মিলেছে। এত দিন ধারণা ছিল, প্রায় ২৫ বছর বয়সের পর তাদের দেহ আর বড় হতো না। কিন্তু নতুন গবেষণা জানাচ্ছে, টি-রেক্সদের শারীরিক বিকাশ ছিল তুলনামূলক ধীরগতির।
জীবনের বড় একটি সময় তারা মাঝারি আকারের দেহ নিয়ে কাটাত। এরপর বয়সের শেষ দিকে খুব দ্রুত আকারে বড় হয়ে উঠত। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তারা বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী শিকার করতে পারত যা তাদেরকে নিজেদের সময়ের সবচেয়ে সফল মাংসাশী প্রাণীতে পরিণত করেছিল।উডওয়ার্ড বলেন, ‘টি-রেক্স কেন ডাইনোসরদের রাজা হয়ে উঠেছিল, এই গবেষণা তা বুঝতে সাহায্য করবে। ধীরে ধীরে বড় হওয়ায় তারা দীর্ঘ সময় ধরে শিকারি হিসেবে সক্রিয় থাকতে পেরেছে।’

এই গবেষণা কয়েক মাস আগের একটি আলোচিত গবেষণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায় পাওয়া যায় দুটি ডাইনোসরের পাশাপাশি থাকা জীবাশ্ম যা ‘ডুয়েলিং ডাইনোসর’ নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়েছিল, লড়াই করতে করতেই তারা মারা গিয়েছিল। এই জোড়া জীবাশ্মের একটিকে ট্রাইসেরাটপস হরাইডাস হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও অন্যটিকে এত দিন একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক টি-রেক্স বলে মনে করা হতো। ধারণা ছিল, মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল প্রায় ২০ বছর।

কিন্তু গত অক্টোবরে এক গবেষণায় দাবি করা হয়, সেটি আসলে টি-রেক্স নয়; বরং ন্যানোটাইর‌্যানাস নামে আলাদা এক প্রজাতির ডাইনোসর। সেই দাবির অন্যতম ভিত্তি ছিল ২০ বছর বয়সে টি-রেক্স নাকি পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যেত। নতুন গবেষণা বলছে, ওই বয়সে টি-রেক্সদের শারীরিক বিকাশ সম্পূর্ণ হতো না। ফলে আগের গবেষণার সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা শুধু টি-রেক্স নয়, সামগ্রিকভাবে ডাইনোসরদের জীবনকাল ও বিকাশ নিয়ে গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। পাশাপাশি বহু পুরোনো ধারণা ও বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

-মামুন