উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলায় চরাঞ্চলে শীতকালে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখি এলেও তা পরিমাণে আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। অনেক চর এখন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। নেই সেখানে পাখির কলরব আর কিচিরমিচির ডাক। কিছু কিছু চরে পাখির দেখা মিললেও পরিমাণ আগের চাইতে অনেক কম। পাখিশুমারি দল, বন বিভাগের কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা বলছে, জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের কারণে ভোলায় আসা পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে। এছাড়াও পাখি শিকারিদের উপদ্রুপ, খাদ্য সংকট, নিরাপদ আবাসস্থলসহ বিভিন্ন কারণে পাখিরা তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করেছে।
আর তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই যদি পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভোলার চরাঞ্চল থেকে অতিথি পাখি পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে পাখি শিকার বন্ধ, চরাঞ্চল সংরক্ষণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
তিনদিকে মেঘনা তেঁতুলিয়া নদী ও এক দিকে সাগরবেষ্টিত উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলায় রয়েছে অসংখ্যা ছোট বড় ডুবোচর। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সাইবেরিয়া তিব্বতসহ শীতপ্রধান দেশ থেকে অতিথি পাখি এসেছে। এসব পরিযায়ী অতিথি পাখি উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলার মাঝের চর, বৈরাগীর চর, মদনপুর, মেদুয়া, নেয়ামতপুর চরে, তেঁতুলিয়া নদীর টেংরার চর, চটকিমারা, গঙ্গাপুর, চরফ্যাসনের তারুয়া, কুকরী-মুকরী, মনপুরা, আন্ডার চর, ঢালচর, চর পালিতাসহ অর্ধশতাধিক ছোট বড় চর আবাসস্থলে পরিণত হলেও এবার আর আগের মতো সেই দৃশ্য নেই। বিশেষ করে ভোলার সদর উপজেলার মেঘনা নদীর কাচিয়া মাঝের চর, দৌলতখানের মেধুয়া, নেয়ামতপুর এলাকায় অসংখ্যা ডুবোচরগুলো এখন বলতে গেলে প্রায় অতিথি পাখি শূন্য। অথচ গত দুই তিন বছর আগেও ব্যাপক পাখির আনাগোনায় মুখরিত ছিল এই চরাঞ্চল।
সরেজমিনে ভোলার মাঝের চর, মদনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ চর প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। দুই একটি চরে কিছু পাখি থাকলেও সংখ্যায় আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, এসব দুর্গম চরাঞ্চলে পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হওয়ার কথা থাকলেও পাখি শিকারিদের কারণে তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই। খাদ্যের সন্ধানে রং-বেরঙের পাখামেলা এসব পাখি উড়তে গিয়েই মারা পড়ছে শিকারিদের হাতে। বিভিন্ন ফাঁদ পেতে নির্বিচারে চলছে পাখি শিকার। এতে নষ্ট হচ্ছে চরাঞ্চলের সৌন্দর্য যেমন। তেমনি নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসম্য।
ওই এলাকার জেলেরা অভিযোগ করেন, শিকারিদের ধানের সঙ্গে বিষ টোপ দেওয়ায় তা ডুবোচরে পানিতে মিশে মাছের ক্ষতি হচ্ছে। এতে করে ওই সব এলাকায় আগের চেয়ে মাছ কমে যাচ্ছে। অতিথি পাখি মরে মাঝে মাঝে পানিতে ভেসে যেতে তারা দেখেন। এসব শিকারির দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবি জানান তারা।
এদিকে ভোলায় আসা পাখিশুমারি দল এ বছর (২০২৬) জানুয়ারিতে(১১-১৮ জানুয়ারি) ৮দিন ভোলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলার চরাঞ্চলে পাখি পর্যবেক্ষণ করে। পর্যবেক্ষণ শেষে পাখি বিশেষজ্ঞ সায়েম ইউ. সাংবাদিকদের জানান, ভোলায় পাখিশুমারি দল ভোলার আশপাশে মেঘনা, তেঁতুলিয়া নদী ও সাগর মোহনার ৫৩টি চরে ৬৩টি প্রজাতির ৪৭ হাজার ১৫৭টি পাখিশুমারি করেছে। এবারে একটি প্রজাতি বেশি দেখা গেছে, যা কয়েক বছর দেখা যায়নি। পাখিটির নাম টাফটেড ডাক, যার বাংলা নাম টিকি হাঁস। শুমারি দল এটা দেখেছে ঠ্যাঙ্গার চরে। সংখ্যায় ছিল ২২০টি।
টিকি হাঁস মাঝারি আকারের ঝুটিয়াল হাঁস। প্রজননকালে পুরুষ হাঁসের পিঠ চকচকে কালো ও দেহতল সাদা দেখা যায়। মাথার চূড়ায় স্পষ্ট সাদা ফোঁটা। মাথা ও ঘাড় ঘন কালো এবং বগল সাদা। মাথার পেছনে বড় ঝুলন্ত ঝুটি থাকে। লেজ, বুক ও অবসারণী কালো; ওড়ার সময় ডানার প্রশস্ত সাদা ছোপ ও অনিয়মিত প্রান্তদেশ চোখে পড়ে। কালো নখ ও আগাসহ ঠোঁট কালচে ফিকে; চোখ উজ্জ্বল হলুদ; কালো আঙুলের পর্দাসহ পা ও পায়ের পাতায় নীলচে-স্লেট রঙ।
শুমারি দলের পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় এ বছর চরাঞ্চলে, যেখানে পাখির বিচরণক্ষেত্র, সেখানে তরমুজের আবাদ বেড়েছে। এসব আবাদে কীট, বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে, যা পাখির জন্য হুমকি। ভোলার পশ্চিমের তেঁতুলিয়া নদী এবং পূর্বের মেঘনা নদীর চরে পরিযায়ী পাখি শিকারিদের কারণেও পাখিরা হুমকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জলচর পাখিশুমারি দলের সদস্যরা।
পাখিশুমারি দলের সদস্য পাখি পর্যবেক্ষক ও বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এভারেস্ট বিজয়ী এম এ মুহিত বলেছেন, গত ২৭ বছরে কিছু পাখি বেড়েছে আবার কিছু কমেছে। পর্যায় ক্রমে পাখি আসার সংখ্যা কমছে। ভোলায় পাখি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তারা দেখছে পাখির আবাসস্থলে কৃষি আবাদ যেমন তরমুজ চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই পাখির জন্য আবাসস্থল সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী গবেষক ও পাখি পর্যবেক্ষক মো. ফয়সাল মনে করছেন, মানুষ যাতে বন্যপ্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয় এবং তাদের উপদ্রপের কারণ না হয় । বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করাসহ সমন্বিত ব্যবস্থাপনা করা হয় তা হলে সমন্বিত মডেল উপস্থাপন করা হলে অন্যান্য দেশে সমাদৃত হবে।
ভোলা উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মনিরুজ্জামান জানান, জলবায়ু প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রভাব পড়ছে। খাবারের সংকট দেখা দিলে অতিথি পাখি পার্শ¦বর্তী চরাঞ্চলে চলে যায়। পাখি যাতে নির্বিঘেœ বিচরণ করতে পারে, তার জন্য পাখি শিকারসহ বন্যাপ্রাণী যাতে নিধন করতে না পারে, তার জন্য নিয়মিত টহল দল কাজ করছে।
-সাইমুন










