সাবেক জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকারীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

সাবেক জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত তেতসুয়া ইয়ামাগামি (মাঝখানে) আদালতে অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে। [ফাইল ছবি: কিয়োডো/রয়টার্স]

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত বন্দুকধারী তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা ওই হত্যাকাণ্ডের সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় পর বুধবার নারার একটি আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।

নারা জেলা আদালতের বিচারক শিনইচি তানাকা রায়ে জানান, ৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামি ২০২২ সালে প্রকাশ্য দিবালোকে আবে-কে গুলি করে হত্যা করেন, যা জাপানের মতো দেশে নজিরবিহীন ঘটনা। জাপানে অস্ত্র সহিংসতা অত্যন্ত বিরল হওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়।

জাপানের আইন অনুযায়ী, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্যারোলের সুযোগ থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দণ্ডপ্রাপ্তরা কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ইয়ামাগামির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করে জানায়, যুদ্ধোত্তর জাপানের ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ড ছিল ‘অভূতপূর্ব’ এবং এর সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। গত অক্টোবরে বিচার শুরুর সময় প্রসিকিউটররা বলেন, ইউনিফিকেশন চার্চের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য থেকেই আবে-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন ইয়ামাগামি।

আদালতে প্রসিকিউটররা জানান, ইয়ামাগামি মনে করেছিলেন, আবে-র মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যা করলে চার্চটির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠবে এবং সমালোচনা তীব্র হবে।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষ সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড চেয়ে যুক্তি দেয় যে, ইয়ামাগামির পরিবার দীর্ঘদিন আর্থিক ও মানসিক সংকটে ভুগেছে। তার মা ইউনিফিকেশন চার্চে পরিবারের সব সঞ্চয় দান করায় পরিবারটি চরম দুর্দশায় পড়ে।

বুধবার সকালে নারার আদালতে প্রবেশের জন্য বহু মানুষ লাইনে দাঁড়ান, যা এই মামলাকে ঘিরে ব্যাপক জনআগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। আবে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং ইউনিফিকেশন চার্চের মধ্যকার গভীর সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। দলটির অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, শতাধিক আইনপ্রণেতার চার্চটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল, যার ফলে এলডিপির প্রতি জনসমর্থন কমে যায়।

জাপানি গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, আদালতে ইয়ামাগামি বলেন, ইউনিফিকেশন চার্চ-সম্পর্কিত একটি অনুষ্ঠানে আবে একবার ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন—এ কারণেই তিনি আবে-র ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন।

১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চ গণবিবাহের জন্য পরিচিত এবং জাপানের অনুসারীদের কাছ থেকেই সংগঠনটি বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে থাকে।

দেশের ভেতরে বিতর্কিত হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিনজো আবে ছিলেন প্রভাবশালী নেতা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করা বিদেশি নেতাদের একজন ছিলেন আবে।

দুই দফায় মোট ৩ হাজার ১৮৮ দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করেন। বর্তমানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও এলডিপি নেত্রী সানায়ে তাকাইচি হলেও সংসদের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দলটির ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

সাবরিনা রিমি/