আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের নীতিমালা তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিচারের ঊর্ধ্বে’ উঠে কাজ করছে বলে নজিরবিহীন মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন এখন মনে করে বৈশ্বিক সমস্যার বহুপাক্ষিক সমাধানের চেয়ে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা ও প্রভাবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।
গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইনকে কেবল তাদের নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে।” মূলত ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিতর্কিত হুমকির প্রেক্ষাপটে মহাসচিব এই কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। গত সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি দাবি করেছিলেন, সাতটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসান তিনি একাই ঘটিয়েছেন, যেখানে জাতিসংঘের কোনো ভূমিকা ছিল না। ট্রাম্প সরাসরি বলেছিলেন, “আমি বুঝতে পেরেছি জাতিসংঘ আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রের) জন্য নয়।”
গুতেরেস স্বীকার করেন যে, ক্ষমতাধর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের সনদ মেনে চলতে বাধ্য করতে সংস্থাটি বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে বড় শক্তিধর দেশগুলোর মতো বিশেষ প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা নেই।”
বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ‘অকার্যকর’ ও ‘বৈষম্যমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মহাসচিব। বিশেষ করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেটো’ ক্ষমতার অপব্যবহারের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধে বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে এই দুই দেশ।”
নিরাপত্তা পরিষদে ইউরোপীয় তিনটি দেশের স্থায়ী সদস্যপদ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গুতেরেস। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘের বৈধতা ধরে রাখতে সংস্কার জরুরি এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থে যাতে বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য ভেটো ক্ষমতা সীমিত করা প্রয়োজন।
পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেস ২০১৭ সালে মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে। মেয়াদের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তাঁর এই বিস্ফোরক মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার বিকল্প নেই বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে পুনরুল্লেখ করেন।
সূত্রঃ বিবিসি রেডিও ৪
-এম. এইচ. মামুন










