দীর্ঘ ১৬ বছরের পরিকল্পনা শেষে এবার বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার চূড়ান্ত পথে হাঁটছে ইরান। এর পরিবর্তে দেশটি সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ বা ‘সিল করা ইনট্রানেট’ চালু করতে যাচ্ছে। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সার্চ ইঞ্জিন ও মেসেজিং অ্যাপ—সবই থাকবে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফিল্টারওয়াচ’ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দাবি, ২০২৬ সালের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরানে ইন্টারনেট আর কোনো নাগরিক অধিকার থাকবে না; বরং এটি হবে সরকারের দেওয়া একটি ‘বিশেষ সুবিধা’।
ফিল্টারওয়াচের প্রতিবেদনে এই নতুন ব্যবস্থাকে ‘ব্যারাক ইন্টারনেট’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- ইরানের জাতীয় ইন্টারনেটে থাকবে সরকার অনুমোদিত সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এবং নিজস্ব ন্যাভিগেশন সেবা। এমনকি নেটফ্লিক্সের আদলে নিজস্ব স্ট্রিমিং সাইটও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে তেহরানের। সাধারণ নাগরিকরা আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ হারাবেন। কেবল নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারি কর্মকর্তারা যাচাই-প্রক্রিয়া শেষে ফিল্টার করা বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। আগে সরকার ক্ষতিকর সাইটগুলো ব্লক করত, কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে কেবল সরকার অনুমোদিত হাতেগোনা কয়েকটি সাইট খোলা থাকবে, বাকি সবকিছু ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে।
মূলত গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে খামেনি প্রশাসন। বিক্ষোভে উসকানি দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে গত ৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়। আন্দোলনকারীরা বিকল্প হিসেবে ‘স্টারলিংক’ ব্যবহারের চেষ্টা করলেও নতুন আইনের মাধ্যমে তা কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্টারলিংক টার্মিনাল রাখাকে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ হিসেবে গণ্য করে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘নেটব্লকস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ১০ দিনে দেশটিতে ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। যদিও সম্প্রতি গুগলসহ কিছু নির্দিষ্ট সেবায় অতি সীমিত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়েছে, তবে তা কঠোরভাবে ফিল্টার করা।
এই ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার ফলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিপিং কোম্পানি ও ব্যাংক লেনদেনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ বন্ধ করাকেই তেহরান এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
চীনের কারিগরি সহায়তায় এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ ডিভাইসের মাধ্যমে ইরান এখন পুরো দেশের ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা ভিপিএন ব্যবহার করেও এড়ানো প্রায় অসম্ভব হবে। ২০২৬ সালের ২০ মার্চ (ইরানি নববর্ষ) নাগাদ এই ‘ডিজিটাল প্রাচীর’ পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রঃ ফিল্টারওয়াচ
-এম. এইচ. মামুন










