জীবনের সপ্তম দশকে এসে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে ভারতীয় সিনেমায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বিআনা ওয়াত্রে মোমিন। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ে শান্ত পারিবারিক জীবন কাটানো এই অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষিকা ৭০ বছর বয়সে অভিনয়ে পা রেখে এখন প্রশংসিত অভিনেত্রী।খবর আলজাজিরার।
মালয়ালম ভাষার চলচ্চিত্র ‘ইকো’ -তে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়েন মোমিন। নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি ইতোমধ্যে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। মোমিন মেঘালয়ের আদিবাসী গারো জনগোষ্ঠীর সদস্য। তুরা সরকারি কলেজের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অভিনয় তো দূরের কথা-শৈশবে তার শহরে সিনেমা হল বা থিয়েটারই ছিল না। “শ্রেণিকক্ষে পড়ানো ছাড়া কখনো অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেইনি,” হাসতে হাসতে বলেন মোমিন। “যদি না ক্লাস নেওয়াকেই এক ধরনের অভিনয় বলা যায়।”
অজানা ভাষা, অজানা পথ
‘ইকো’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মেঘালয় থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে কেরালায় যেতে হয়েছিল তাকে। ভাষা বোঝেন না, সিনেমার সেটও অচেনা-তবু মেয়ের অনুপ্রেরণায় এই ঝুঁকি নেন তিনি।
“আমি দ্বিধায় ছিলাম,” বলেন মোমিন। “কিন্তু মেয়ে বলেছিল, নিজেকে বিশ্বাস করতে এবং নতুন কিছু চেষ্টা করতে।” চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন ‘ম্লাথি চেট্টাথি’ চরিত্রে—পশ্চিমঘাট পর্বতমালার গভীর জঙ্গলে একা বসবাসকারী এক রহস্যময় বৃদ্ধা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মালয়েশিয়া থেকে পালিয়ে আসা এই চরিত্রটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠে গল্পের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু।
স্বল্প বাজেট, বড় প্রভাব
মাত্র ৪৫ দিনে স্বল্প বাজেটে নির্মিত ‘ইকো’ একটি মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার হিসেবে পরিচিত হলেও, এটি সহজ কোনো ঘরানায় ধরা দেয় না। পরিচালক দিনজিথ আয়্যাথান জানিয়েছেন, চরিত্রটির জন্য তিনি এমন একজন মুখ খুঁজছিলেন, যিনি পরিচিত নন কিন্তু চরিত্রে গভীরতা আনতে পারবেন।
সেই খোঁজেই মোমিনের নাম উঠে আসে—এর আগে গারো লোককথা নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ের ক্লিপ নির্মাতাদের নজরে পড়ে।
চলচ্চিত্রটির লেখক ও চিত্রগ্রাহক বাহুল রমেশ বলেন, “প্রথম অডিশনেই তার স্বতঃস্ফূর্ততা, সংযত আবেগ আর আত্মবিশ্বাস আমাদের মুগ্ধ করে। ৭০ বছর বয়সে এত দূরে এসে নতুন কিছু করার সাহসই তাকে আলাদা করে তোলে।”
নতুন ছাত্রের মতো শিখছেন
মালয়ালম ভাষা না জানলেও ভাষা প্রশিক্ষকের সহায়তায় সংলাপ মুখস্থ করে শুটিং করেন মোমিন। পরে কণ্ঠ অন্য শিল্পী দিয়ে ডাব করা হলেও শুটিংয়ের সময় সব সংলাপ তিনিই বলেন।
প্রতিদিন পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়েছে, কখনো ভারী বৃষ্টি, কখনো কুয়াশার সঙ্গে লড়াই-তবু অসুস্থ হননি তিনি। “আমি শক্ত মনের নারী,” বলেন মোমিন। “কেরালার খাবারও সাহস করে খেয়েছি।” তার অভিনয়কে ‘স্বাভাবিক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন’ বলে উল্লেখ করেছেন নির্মাতারা। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা ধানুশ একে ‘বিশ্বমানের অভিনয়’ বলে প্রশংসা করেছেন।
প্রতিনিধিত্বের আশা
‘ইকো’-র সাফল্যের পর বলিউডসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রস্তাব আসছে মোমিনের কাছে। তবে তিনি সতর্ক। “অভিনয় কঠিন কাজ। দেখি ভবিষ্যতে কী আসে,” বলেন তিনি।এখন আপাতত তিনি ফিরে গেছেন নিজের পুরোনো জীবনে-পরিবার, নাতি-নাতনি আর বইয়ের ক্লাব নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।“আমি গর্বিত,” বলেন মোমিন। “একজন আদিবাসী নারী হিসেবে, এই বয়সে আমাকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, এটি আরও প্রতিনিধিত্বের পথ খুলে দেবে।”
-বেলাল হোসেন










