সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে মাদক কারবার: বাড়ছে উদ্বেগ

প্রচলিত ও অপ্রচলিত বিভিন্ন ধরনের মাদক এখন অনলাইনে বেচাকেনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন মাদককারবারি ও মাদকসেবীরা। লেনদেন হচ্ছে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও। এ ছাড়া ডার্কওয়েবে মাদক বেচাকেনা হচ্ছে ও বিট কয়েনে মাদকের লেনদেন করছেন কারবারিরা।

প্রযুক্তির কল্যাণে সারা বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে গেছে। এর ফলে সারা বিশ্বেই মাদকের বাজার যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি নতুন নতুন মাদক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মাদক কারবারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে গোপন গ্রুপ ও ইনবক্সের মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা পরিচালিত হচ্ছে। কোড ভাষা, ইমোজি ও ছদ্মনাম ব্যবহার করে ক্রেতা ও বিক্রেতারা সহজেই একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে তরুণ ও কিশোরদের মাঝে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে মাদক কারবারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কৌতূহল, বন্ধুত্বের প্রভাব এবং সহজপ্রাপ্যতার কারণে অনেক তরুণ এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে অপরাধ, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, সাইবার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি চক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এই অপরাধ দমন করা দিন দিন আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই সমস্যার সমাধান করতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের নৈতিক শিক্ষা এবং অভিভাবকদের নজরদারি বাড়ানোর মাধ্যমে মাদক কারবারের এই ভয়ংকর প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, নানা কৌশলে এবং নানা উপায়ে দেশে প্রচলিত এবং অপ্রচলিত মাদকের বিস্তার ঘটছে। এগুলো প্রতিরোধ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কৌশল এবং পদক্ষেপ সঠিক নয়। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তদন্তেও মাদকের উৎস, রুট এবং মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম আসছে না।

এদিকে, নিয়মিত মাদকের পাশাপাশি দেশে অশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ‘পার্টি ড্রাগ’ বা ‘ফেন্সি ড্রাগ’-এর আমদানি। কুরিয়ার সার্ভিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব মাদক প্রবেশ করছে দেশে। অনলাইনে ডার্কওয়েবে বিট কয়েনে চলছে এসব মাদকের বেচাকেনা। সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জানা যায়, দেশে গাঁজা বা ক্যানাবিসের ব্যবহার পুরোনো। আশির দশক পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্র থেকে গাঁজা বিক্রি হতো। ১৯৮৮ সালে গাঁজা নিষিদ্ধ হওয়ার পর মাদকের বাজার দখল করে নেয় অপিয়ডস বা ঘুম-অবসাদ উৎপাদনকারী মাদক হেরোইন। এই গোত্রভুক্ত অন্যান্য মাদক, যেমন প্যাথেডিন, কোডেইন (ফেনসিডিল) ও মরফিনের ব্যবহারও পুরোনো। এরপর বাজারে আসে স্টিমুল্যান্টস বা উত্তেজক মাদক ইয়াবা।

অন্যদিকে, ঢাকায় প্রথম এলএসডি উদ্ধার করা হয় ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে। এলএসডির ২৫টি স্ট্রিপ ও তরল এলএসডি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেফতার দুই বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র জানান, তেলের বোতলে ভরে কানাডা থেকে তারা তরল এলএসডি ও ডাকটিকিটের মতো দেখতে এলএসডি স্ট্রিপ নিয়ে এসেছিলেন। কেনাবেচা চলছিল অনলাইনে।

ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গ্রেফতারকৃতদের মোবাইল ফোন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে তারা হোয়াটঅ্যাপ, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে মাদকের বাবসা করছিল। গ্রেফতারকৃতরা সবাই দেশের স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামে স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদেও সাথে প্রযুক্তিতে দক্ষ, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির আরোও বেশ কয়েকজনের একটি চক্র গাঁজা/কুশ/এমডিএমএ/ কিটামিনসহ অন্যান্য আধুনিক মাদক পার্সেলযোগে উন্নত দেশ থেকে আমদানি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরে পার্টি ড্রাগ হিসেবে বিভিন্ন ডিজে পার্টিতে এবং অভিজাত সোসাইটিতে সরবরাহ করতো।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দিন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ডিএনসির অভিযান চলমান আছে এবং এই কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি করা হবে। গ্রাম পর্যায়ে মাদকের বিস্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু ডিএনসিই নয়, পুলিশসহ অন্য সংস্থাগুলোও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কোনো মাদকই দেশে উৎপাদিত হয় না, মাদক আসে দেশের বাইরে বিভিন্ন মাধ্যম ও রুট ব্যবহার করে।

 

সুশান্ত সাহা