আগামীর নির্বাচনে কৃষক সমাজ কতটা গুরুত্ব পাবে?

প্রফেসর ড. শাফিউল ইসলাম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘণ্টা ইতোমধ্যে বেজেছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট একই সাথে অনু্ষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার মসনদে বসার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ভোটের মাঠে জোট বাঁধার রাজনীতি ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে। ক্ষমতার জন্য দল বিলুপ্ত করার ঘোষণার পাশাপাশি দলের পদ ছেড়ে বড় দলে ভিড়তেও দেখা যাচ্ছে। নিজের লাভ, দলের লাভ—এই হিসেবই প্রাধাণ্য পাচ্ছে। এমনটি দৃশ্যমান হচ্ছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর রাজনীতির ময়দানে এমন দৃশ্য প্রত্যাশিত না হলেও এটিই ঘটছে।

আমাদের প্রত্যাশা ছিল সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের কৃষক সমাজ রাজনীতির মূল আলোচনায় থাকবে। তবে এখনো আমরা আশাবাদী-রাজনীতিকরা কৃষক সমাজকে অবশ্যই গুরুত্ব দেবেন। এই উদ্বেগ প্রকাশের কারণ হচ্ছে-আমরা প্রায় শুনতে পাই, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য পান না। নানা কারণেই কৃষক সমাজ বঞ্চিত। চাহিদা মতো কৃষি উপকরণ সময় মতো না পাওয়া থেকে তাদের এই বঞ্চনার শুরু হয়। আর শেষ হয়, ঘাম ঝড়ার মধ্য দিয়ে উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য না পাওয়া মধ্য দিয়ে। এখানে একটি কৃষি পণ্যের উদাহরণ দিয়েই বিষয়টি আমরা বুঝার চেষ্টা করবো।
দেশে আলু উৎপাদনে শীর্ষ জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে রংপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী ও মুন্সীগঞ্জ। চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় দামের ওপর প্রভাব পড়বে। এতে কৃষকরা পণ্যের নায্য মূল্য না পাওয়ার আশংকাও করবে। ঘটেছেও তাই। দেশের উত্তর জনপদে যে সব কৃষি পণ্য বেশি পরিমাণে উৎপাদন হয় তার মধ্যে আলু অন্যতম। রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী জেলার তানোর-গোদাগাড়িসহ আশে-পাশের উপজেলাগুলোতে ব্যাপক হারে এই কৃষি পণ্য উৎপাদন হয়। এই বিভাগের আরেকটি জেলা জয়পুরহাটের কালাই-ক্ষেতলাল উপজেলাতেও ব্যাপকহারে আলু চাষের খ্যাতি রয়েছে সারা দেশে।

সোমবার ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আলোকিত স্বদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজশাহীর ৩৯ টি হিমাগারে প্রায় ৪৫ হাজার টন পুরনো আলু এখনো মজুত আছে। নতুন আলো বাজারে আসায় পুরোনো আলুর চাহিদা কমে গেছে। ক্রেতারা নতুন আলুই কিনছেন। আড়তদার ও পাইকারি আলু ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো আলু কেউ কিনছেন না। ফলে হিমাগার ফটকে বেচাবিক্রি প্রায় বন্ধ। এতে করে বিপাকে পড়েছেন হিমাগার মালিকগণ। বেশি লাভের আশায় যেসব ব্যবসায়ী ও চাষি হিমাগারে আলু রেখেছিলেন, তারা আর আলু তুলছেন না এবং হিমাগার ভাড়ার টাকাও পরিশোধ করছেন না। আরো জানা যায়, হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনের জন্য হিমাগার মালিকরা মাইকিং করলেও চাষি বা ব্যবসায়ীরা কেউই আসছেন না। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্যমতে, গত মৌসুমে রাজশাহীতে আলু চাষ হয়েছিল ৪০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে।

আলু উৎপাদন হয়েছিল ১০ লাখ ১৩ হাজার টন। ‘নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বাসিন্দা রাসেল রানা এবার সাত বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু পেয়েছেন ৬৩০ মণ। লাভের আশায় ৩২০ মণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন। তাতে এখন বড় লোকসানে তিনি ( প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০২৫)। রানার হিসেব মতে, প্রতি বস্তা আলু হিমাগারে রাখার ভাড়া ৩৫০ টাকা। বস্তার দাম ৮৫ টাকা। পরিবহণ ও শ্রমিক খরচ ১০০ টাকা। সব মিলিয়ে এক বস্তা আলু হিমাগারে রাখার জন্য তার খরচ পড়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা। কিন্তু এক বস্তা আলু জাতভেদে হিমাগার থেকে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ৬০ কেজির বস্তা প্রতি লোকসান ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। পত্রিকান্তরে জানা যায়, এ বছর সারা দেশে ৩৫৩ টি হিমাগারে প্রায় ৩৫ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু আলুর দাম কম হওয়ার হিমাগার থেকে কাঙ্খিত পরিমাণ আলু বের হচ্ছে না। এরই মধ্যে নতুন আলু বাজারে। ফলে পুরনো আলুর কদর কমে গেছে।
হিমাগার মালিকদের ভাষ্য মতে, দেশে আলুর সর্বোচ্চ বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। আর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে দেশে আলু উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টন। আগের বছরে (২০২৩-২০২৪) উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ টন।

এতে করে বুঝা যায়, যোগান-চাহিদা এবং উৎপাদন খরচের মধ্যে এক ধরনের তারতম্য বিদ্যমান। ফলে কোন কোন ক্ষেত্রে ভোক্তা কম দামে পণ্য ক্রয় করার সুযোগ পেলে উৎপাদনকারী কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হন। তবে, কৃষক থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌছাতে মাঝখানে মধ্যসত্ত্বভোগীরাই বেশি লাভবান হন। ভোক্তা অধিক দামে পণ্য ক্রয় করলেও কৃষক তার নায্য মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই পায় না শুধুমাত্র মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্নের কারণে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পচনশীল পণ্যসহ সব নিত্য পণ্যের দাম চড়া থাকে। ফলে উৎপাদনকারী কৃষকরা তাদের পণ্যের নায্য মূল্য পায় না। অনেক সময় সরকারকে বাধ্য করে ব্যবসায়ীদের অনুকূলে নীতি গ্রহণ করতে।
এরকম পরিস্থিতিতে, দেশে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের নায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নীতি নির্ধারকদের এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা মেটানোর জন্য সমবায় ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা, আলু প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং এর পাশাপাশি রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবেই এই কৃষি পণ্যের উৎপাদন সফল হবে।

সামনে জাতীয় নির্বাচন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোট পাবার আশায় নানা রকম ভালো কথার ফুলঝুরি ছড়াবে। নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পর তারা আর তাদের প্রতিশ্রুতি সেভাবে রক্ষা করে না। অতীতে এরকমই দেখা গেছে। চব্বিশের বিপ্লবের পর দেশের প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। রাজনৈতিকদলগুলোর কাছে কৃষক সমাজের এখন দাবি থাকবে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়; বাস্তব ভিত্তিক ও বাস্তবায়ন যোগ্য কর্মসূচী পেশ করার। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য মূল্য কিভাবে নিশ্চিত হবে—এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কি ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করবে তার বিস্তারিত পরিকল্পণাও কৃষক সমাজ আজ জানতে চায়। এসব পরিকল্পণা বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক সেই বিষয়টিও কৃষক সমাজ অনুধাবণ করতে চায়। কৃষক বাঁচলে, দেশ বাঁচবে—এই কথার মর্মার্থ রাজনৈতিকদলগুলোতে বুঝতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা—রাজনৈতিকদলগুলো কৃষক সমাজের মনের কথা বাস্তবায়নের জন্য তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়গুলো সেভাবেই তুলে ধরবেন। কৃষকসমাজও এসব ইশতেহার বিশ্লেষণ করেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। যেই দলই সরকার গঠন করুক; কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে—এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: প্রফেসর, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।