ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্ক এখন চরম উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের অবসান ঘটানোর সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “ইরানে এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে।”
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) খামেনির এক বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। এর আগে খামেনি ইরানে চলমান অস্থিরতা ও কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছিলেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে খামেনির সেই এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টগুলো পড়ে শোনানো হয়, যেখানে বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য তাকে দায়ী করা হয়েছে। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইরানের শাসকরা কেবল দমন-পীড়ন ও সহিংসতার ওপর ভর করে টিকে আছে। তিনি খামেনিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “এই লোকটি একজন অসুস্থ মানুষ। নেতৃত্ব মানে সম্মান অর্জন করা, ভয় আর মৃত্যুর মাধ্যমে শাসন করা নয়।”
ট্রাম্প আরও যোগ করেন, “দেশের নেতার উচিত নিজের দেশ সঠিকভাবে পরিচালনা করা, যেমনটি আমি যুক্তরাষ্ট্রে করি। নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা কোনো সুস্থ নেতৃত্বের লক্ষণ হতে পারে না।”
এদিকে শনিবার এক ভাষণে খামেনি বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সাধারণ কোনো আন্দোলন নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে তৈরি একটি ‘বিদ্রোহ’। তিনি ট্রাম্পকে ‘ক্রিমিনাল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “বিক্ষোভ চলাকালীন ইরানি জনগণের ওপর যে হতাহত, ক্ষয়ক্ষতি ও অপবাদ চাপানো হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হবে।” তিনি দাবি করেন, আমেরিকার আসল লক্ষ্য হলো ইরানকে আবারও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বা ‘গিলে ফেলা’।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ ইরান সরকার দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ করে রেখেছে। নেটব্লকসের তথ্যমতে, শনিবার দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিকের তুলনায় মাত্র ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। একদিকে ট্রাম্প ‘সাহায্য আসছে’ বলে বিক্ষোভকারীদের আশ্বাস দিচ্ছেন, অন্যদিকে তেহরান বিক্ষোভকারীদের ‘বিদেশি চর’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে। ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, মার্কিন কোনো স্থাপনায় হামলা হলে ইরানকে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ইরানের রাজপথের লড়াই এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল দাবার চালে পরিণত হয়েছে, যার শেষ কোথায়—তা এখনো অনিশ্চিত।
-এম. এইচ. মামুন










