সিরিয়ার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তনের খবর পাওয়া গেছে। দীর্ঘ অচলাবস্থা ভেঙে পূর্ব আলেপ্পো প্রদেশের একটি বিশাল এলাকা এখন সিরীয় আরব সেনাবাহিনীর (এসএএ) নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হওয়া একটি সমঝোতার আওতায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) পিছু হটলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে এক পক্ষ এলাকা ছাড়লেও অন্য পক্ষের অগ্রযাত্রাকে কেন্দ্র করে নতুন করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
সিরীয় সেনাবাহিনীর অপারেশনস ডিরেক্টরেট জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেইর হাফের এবং মাসকানাসহ ওই অঞ্চলের অন্তত ৩০টির বেশি শহর ও গ্রাম এখন সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। দেইর হাফেরে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তল্লাশি অভিযানে এসডিএফের একটি বিশাল অস্ত্রভান্ডার জব্দ করার দাবিও করেছে সিরীয় সরকার।
পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মাঠপর্যায়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সিরীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রাক্কার দিবসি আফনান এলাকায় ড্রোন হামলায় তাদের দুই সেনা নিহত হয়েছেন, যার পেছনে পিকেকে-ঘনিষ্ঠ মিলিশিয়ারা দায়ী।
অন্যদিকে এসডিএফ অভিযোগ করেছে, চুক্তিতে নির্ধারিত ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সরকারি বাহিনী ভারী অস্ত্র ও ট্যাঙ্ক নিয়ে এলাকায় ঢুকে পড়ায় সংঘর্ষ শুরু হয় এবং তাদের বেশ কয়েকজন যোদ্ধা নিহত হন। উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাক্কার তাবকা এলাকায় সর্বাত্মক কারফিউ জারি করেছে এসডিএফ।
সরকারি বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, রাক্কার পশ্চিমাঞ্চলের শুয়াইব আল-জিকর সেতুর কাছে পিকেকে-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধারা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছে। সেনাবাহিনীর আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক সমঝোতা ব্যাহত করতে সেতুটি উড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। তেহরান ও দামেস্ক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে এর ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল যখন অভ্যন্তরীণ সংঘাতে উত্তাল, তখন দক্ষিণ সীমান্তে নতুন সংকট তৈরি করেছে ইসরায়েল। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের মারিয়া ও আবদিন গ্রামের কাছে ইসরায়েলি বাহিনী অনুপ্রবেশ করেছে। এছাড়া কুনেইত্রা প্রদেশের বেশ কিছু গ্রামেও ইসরায়েলি সেনা তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে, যা সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও সামরিক এই অস্থিরতার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তর (ওচা) জানিয়েছে, আলেপ্পোয় সাম্প্রতিক তীব্র লড়াইয়ের ফলে অন্তত ৫৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। খাবার, ওষুধ ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে ওই অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘনিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী, অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে ইসরায়েলি অনুপ্রবেশ—সব মিলিয়ে সিরিয়া এখন এক জটিল বহুমুখী সংকটে নিমজ্জিত। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
-এম. এইচ. মামুন










