কাতারের ব্যাংকে ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের অর্থ: ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা কী

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র—এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে এই তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ কোথায় রাখা হচ্ছে, সেই বিষয়টি। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ আপাতত কাতারের একটি ব্যাংকে জমা রাখা হচ্ছে, যা নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

একটি ব্যাখ্যা হলো, ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় দ্রুত ও ঝামেলামুক্তভাবে অর্থ পাঠানোর জন্য কাতারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আবার সমালোচকদের মতে, তৃতীয় দেশে অর্থ জমা রাখা কতটা নৈতিক ও স্বচ্ছ—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র কখনোই গোপন করেনি যে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের ওপর তাদের আগ্রহ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করা হয়েছে এবং সেই অর্থ কাতারের ব্যাংকে রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি কেবল শুরু। ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি করে আরও বড় অঙ্কের অর্থ আসবে। তবে তেল কোম্পানিগুলো এখনো নিরাপত্তা ও আইনি নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। পর্যাপ্ত সুরক্ষা না পেলে তারা ভেনেজুয়েলায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

সিএনএনকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ব্যাংকে রাখা হয়নি এবং সরাসরি ভেনেজুয়েলাতেও পাঠানো হয়নি। বরং কাতারকে বেছে নেওয়া হয়েছে একটি মধ্যবর্তী নিরাপদ পথ হিসেবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, তেল বিক্রির অর্থ ধাপে ধাপে ভেনেজুয়েলায় পাঠানো শুরু হয়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করায় ধারণা করা হচ্ছে, আয়ের একটি অংশ ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে।

ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় কার্যত বিচ্ছিন্ন। অতীতে বিদেশি তেল কোম্পানির সম্পদ জব্দ করায় তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ দাবিও রয়েছে। এসব পাওনাদার যেন তেল বিক্রির অর্থের ওপর দাবি তুলতে না পারে, সে লক্ষ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে।

ওই আদেশে বলা হয়েছে, তেল বিক্রির আয়ের ওপর কোনো ধরনের আইনি দাবি বা লিয়েন আরোপের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে। প্রশাসনের যুক্তি হলো, আইনি জটিলতায় অর্থ আটকে গেলে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিমা কোম্পানি ও পাওনাদারদের হাত থেকে অর্থ দূরে রাখতেই কাতারের ব্যাংকে অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। কাতার দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে এক ধরনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, যা এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করেছে।

তবে স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট কাঠামো প্রকাশ না করা হলে এটি কার্যত একটি ‘গোপন তহবিল’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। আশঙ্কা রয়েছে, এই অর্থ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠী বা আধা সামরিক শক্তিকে তুষ্ট করতেও ব্যবহৃত হতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, কাতারে অর্থ পাঠানোর পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী। ডেমোক্রেটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন অভিযোগ করেছেন, জব্দ করা সম্পদ বিক্রি করে অফশোর হিসাবে অর্থ রাখা আইনি ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।

ভেনেজুয়েলার তেলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের পেছনে রয়েছে বাস্তব জ্বালানি চাহিদা। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও তারা মূলত হালকা অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। অথচ তাদের পরিশোধনাগারগুলো চালাতে প্রয়োজন হয় ভারী অপরিশোধিত তেল, যা দেশটির নিজস্ব উৎপাদনে পর্যাপ্ত নয়।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারী তেলের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করতেই হয়। কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার কাছে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভারী তেলের মজুত। এই বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার তেলকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্বের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

-আফরিনা সুলতানা/