পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা রোধে এক নতুন প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছেন ভোলার তরুণ উদ্ভাবক মো. তাহসিন। শিশুর গলায় ঝুলিয়ে রাখা যাবে এমন লকেট আকৃতির একটি ডিভাইস তিনি তৈরি করেছেন, যা পানির সংস্পর্শে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে সতর্ক সংকেত পাঠাবে।
মাত্র দুই গ্রাম ওজনের এই ডিভাইসটি শিশুটি পানিতে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন ঘরের ভেতরে স্থাপন করা রিসিভার থেকে জোরালো সাইরেন বাজতে শুরু করে এবং একই সময়ে অভিভাবকের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল চলে যায়। প্রয়োজনে জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশুটি কোথায় পানিতে পড়েছে, সেই অবস্থানও শনাক্ত করা সম্ভব।
উদ্ভাবক তাহসিনের জন্ম ২০০৭ সালে ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট এলাকায়। তার বাবা ক্বারী আব্দুল হালিম স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। পারিবারিক উৎসাহ ও নিজের আগ্রহ থেকেই খুব অল্প বয়সে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করেন তাহসিন। এরই মধ্যে তিনি ১৫টি উদ্ভাবনী প্রকল্প তৈরি করেছেন, যা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন।
২০২৪ সালে মনপুরা হাজিরহাট সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করা তাহসিন বর্তমানে ঢাকার ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়ন করছেন।
শৈশবে তাহসিনের ছোট বোন দুবার পানিতে পড়ে যায়। যদিও সে দুবারই প্রাণে বেঁচে যায়, তবে তার দুই খালাতো বোন বাড়ির পুকুরে ডুবে মারা যায়। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই তাকে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
দীর্ঘ আট থেকে নয় মাস গবেষণার পর তিনি তৈরি করেন এই ডিভাইসটির কার্যকর সংস্করণ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’। এতে ব্যবহার করা হয়েছে ইএসপি-৩২, জিএসএম মডিউল, ৩১৫ মেগাহার্টজ ট্রান্সমিটার-রিসিভার এবং ব্যাটারি। ডিভাইসটি পানিতে পড়লে পানির ভেতরের মুক্ত ইলেকট্রনের কারণে সার্কিট সক্রিয় হয়ে রিসিভারে সংকেত পাঠায়, ফলে সতর্ক ব্যবস্থা চালু হয়।
এ পর্যন্ত এই উদ্ভাবনে খরচ হয়েছে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তবে বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করা গেলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যেই এটি বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব বলে মনে করেন উদ্ভাবক।
ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ভোলা একটি দ্বীপ জেলা হওয়ায় এখানে পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে। তাহসিনের এই উদ্যোগ বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করা হবে।
ভোলা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, নদী ও জলাশয়বেষ্টিত এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাহসিনের উদ্ভাবিত ডিভাইসটি সেই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি আরও উন্নত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
উদ্ভাবক তাহসিন মনে করেন, তার ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে ভবিষ্যতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এজন্য তিনি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন।
-সাবরিনা রিমি









