দীর্ঘ আট বছরের শীতল সম্পর্ক আর কূটনৈতিক টানাপড়েন পেছনে ফেলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে বেইজিংয়ে মিলিত হলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ দুই নেতার করমর্দন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অটোয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সফরের পর থেকে কানাডা-চীন সম্পর্ক ক্রমশ তলানিতে ঠেকেছিল। বিশেষ করে ২০১৮ সালে ভ্যাঙ্কুভারে হুয়াওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝুর গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীতে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে চীনে দুই কানাডীয় নাগরিকের বন্দি হওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। প্রায় এক দশক পর মার্ক কার্নির এই সফরকে তাই উভয় দেশের কর্মকর্তারাই ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্ক কার্নির এই সফরের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হলো ‘অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ’। কানাডার অর্থনীতির সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ নীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অটোয়া এখন চীনের বিশাল বাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব বাড়াতে চাইছে। গত কয়েক বছরে কৃষি ও প্রযুক্তি পণ্যের ওপর বেইজিং ও অটোয়া যে পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক বাধা আরোপ করেছিল, তা কাটিয়ে উঠতে একটি বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানোই কার্নির মূল লক্ষ্য।
সফরের দ্বিতীয় দিনে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর কার্নি প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে শি চিনপিং কানাডার সাথে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের’ ভিত্তিতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে কার্নি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়ে জানান, অতীতের তিক্ততা পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
সফরটি ‘সফল’ বলে দাবি করা হলেও অনেকগুলো অস্বস্তিকর বিষয় এখনো অমীমাংসিত। কানাডার গত নির্বাচনে চীনের গোপন হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ উঠেছিল, তা নিয়ে অটোয়ায় এখনো তদন্ত চলছে। উইঘুর মুসলিম এবং হংকং পরিস্থিতি নিয়ে কানাডার অবস্থান বেইজিংয়ের কাছে সবসময়ই আপত্তিকর ছিল। বর্তমানে বেইজিংয়ে কানাডীয় সাংবাদিকদের সংখ্যা নগণ্য। শীতল সম্পর্কের কারণে বড় মিডিয়া হাউজগুলো সেখান থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছিল, যা এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি।
চীন সফর শেষ করেই প্রধানমন্ত্রী কার্নি কাতার সফরের উদ্দেশ্যে দোহা রওনা হবেন। সেখানে তিনি কাতারের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বেইজিং থেকে দোহা—এই ধারাবাহিক সফরটি এটাই প্রমাণ করে যে, মার্ক কার্নি কানাডার কূটনীতিকে কেবল পশ্চিমা বলয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক দক্ষিণ ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনে বদ্ধপরিকর।
মার্ক কার্নির বেইজিং সফরটি কানাডার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক সুযোগ, অন্যদিকে পশ্চিমা মিত্রদের সাথে কৌশলগত মূল্যবোধের ভারসাম্য রক্ষা—এই দুই নৌকায় চড়ে কার্নি কতদূর যেতে পারেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়। তবে এই সফর যে অন্তত আট বছরের বরফ কিছুটা হলেও গলিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
-এম এইচ মামুন










