আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এবারের বিতর্কের মূলে রয়েছে প্রবাসীদের জন্য চালু করা ‘পোস্টাল ব্যালট’ ব্যবস্থা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ব্যালট পেপার নিয়ে অনিয়মের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। বিএনপি একে ‘কারচুপির নতুন পথ’ হিসেবে অভিহিত করলেও জামায়াতে ইসলামী একে তাদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছে।
ব্যালট পেপার নিয়ে প্রবাসে লঙ্কাকাণ্ড
সম্প্রতি বাহরাইনের হিদ এলাকায় বেশ কিছু পোস্টাল ব্যালট কয়েকজন মিলে গণণা করছেন—এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এরপর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে একই ধরণের ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনৈতিক মহলে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইসির কাছে ব্যাখ্যা চায় বিএনপি
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এক বৈঠকের পর দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বাসায় ২০০-৩০০ করে ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে, কোথাও কোথাও জব্দ হচ্ছে। এটি প্রবাসীদের প্রথম এক্সারসাইজ হলেও আমরাই ভিকটিম হচ্ছি। একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।”
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ব্যালট পেপারে প্রতীকের ক্রমবিন্যাস উদ্দেশ্যমূলক। তিনি বলেন, “বিএনপির প্রতীক ধানের শীষকে মাঝামাঝি রাখা হয়েছে, যা কাগজ ভাঁজ করলে আড়ালে পড়ে যেতে পারে। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।” স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বৈষম্যের প্রতিকার দাবি করেছেন।
ষড়যন্ত্রের পাল্টা অভিযোগ জামায়াতের
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “বিদেশে জামায়াতের কোনো শাখা নেই, তাই সেখানে দলের কোনো কমিটি বা নেতা থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে।” প্রতীকের ক্রমবিন্যাস নিয়ে তিনি বলেন, এটি বর্ণানুক্রমিকভাবে (Alphabetical Order) করা হয়েছে, এখানে কোনো বিশেষ সুবিধার সুযোগ নেই।
কঠোর অবস্থানে নির্বাচন কমিশন
বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, “ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটি রক্ষায় কোনো ছাড় নেই। কেউ অনিয়ম করলে ফৌজদারি মামলা, এনআইডি ব্লক এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে লাইভ ভেরিফিকেশন ছাড়া কোনো ভোট গ্রহণ করা হবে না।”
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, বাহরাইনের ঘটনাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং সেখানকার রাষ্ট্রদূত ও ডাক বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
পরিসংখ্যান ও বিশেষজ্ঞ মতামত
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলিম সতর্ক করে বলেন, “পোস্টাল ব্যালটের অনিয়ম পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। কোনো কোনো আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এই ভোটগুলো বড় ভূমিকা রাখবে।”
এক নজরে পোস্টাল ব্যালট তথ্য:
-
মোট নিবন্ধিত ভোটার: ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন।
-
প্রবাসী ভোটার: প্রায় ৮ লাখ (শীর্ষে সৌদি আরব: ২.৩৯ লাখ)।
-
আসনভিত্তিক শীর্ষে: ফেনী-৩ (১৬ হাজার ৯৩ জন)।
-
জেলাভিত্তিক শীর্ষে: কুমিল্লা (১ লাখ ১২ হাজার ৯০ জন)।










