ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার বলেছেন, তেহরান কোনোভাবেই “শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবে না”। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি তিনি দেশের ভেতরের তথাকথিত “দাঙ্গাকারীদের” বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের নির্দেশ দেন, যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে অস্থিরতা বাড়ছে।
ধর্মীয় এক উৎসব উপলক্ষে রেকর্ড করা টেলিভিশন ভাষণে খামেনি বলেন, রোববার থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দুই ডজনেরও বেশি শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি অর্থনৈতিক দুর্ভোগের কথা স্বীকার করলেও রাজনৈতিক দাবিদাওয়াকে কঠোরভাবে নাকচ করেন।
“আমরা প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে কথা বলব, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন,” বলেন খামেনি। “দাঙ্গাকারীদের তাদের জায়গায় রাখতে হবে।”
তার এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন এর একদিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘লকড অ্যান্ড লোডেড অ্যান্ড রেডি টু গো’। কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে তা স্পষ্ট না করলেও, এই হুমকি তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে—বিশেষ করে গত গ্রীষ্মে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক নেতাদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর।
‘বাজারিরা ঠিকই বলেছে’
ভূরাজনৈতিক চাপের কথা অস্বীকার করলেও খামেনি স্বীকার করেন, মুদ্রা রিয়ালের দরপতনে বাজারি ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ যৌক্তিক।
“বাজারিরা ঠিকই বলেছে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা করা অসম্ভব—এ কথা বলা তাদের অধিকার,” বলেন তিনি। “দোকানদাররা এই অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, আর সেটি পুরোপুরি ন্যায্য।”
তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
সহিংসতা ও গ্রেপ্তার বেড়েছে
কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক অভিযোগ নিয়ে সংলাপের আশ্বাস দিলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, সহিংসতা ও গ্রেপ্তার দ্রুত বেড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।
সরকারি হিসেবে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য নিহত এবং এক ডজনের বেশি আহত হয়েছেন।
কুর্দি অধিকার সংগঠন হেংগাও জানায়, শুক্রবার রাত পর্যন্ত তারা ১৩৩ জনের গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা আগের দিনের তুলনায় ৭৭ জন বেশি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পশ্চিম ও মধ্য ইরানে আরও গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে; যাদের বিরুদ্ধে পেট্রোল বোমা ও ঘরে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে বিক্ষোভ
দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। আধা-সরকারি ফার্স সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, তেহরানের উপকণ্ঠ কারাজে বিক্ষোভকারীরা ইরানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে “স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক” স্লোগান দেন।
অধিকার সংগঠনগুলোর ছড়ানো ভিডিওতে দেখা যায়, মিছিলকারীরা চিৎকার করে বলছেন, “দর্শক চাই না—যোগ দিন!”
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ছোট শহরগুলোতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের খবর দিয়েছে। মেহর সংবাদ সংস্থা জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় হারসিন শহরে বাসিজ বাহিনীর সদস্য আলি আজিজি ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হন। তাসনিম সংবাদ সংস্থার মতে, পবিত্র নগরী কোমে এক ব্যক্তি যে গ্রেনেড ব্যবহার করতে যাচ্ছিল, সেটিই তার হাতে বিস্ফোরিত হয়ে তিনি নিহত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর অস্থিরতার খবর ছড়িয়েছে। কিছু কর্মী লিখেছেন, “এটাই শেষ লড়াই নয়, পাহলভি ফিরে আসছে!”
তবে সহিংসতার খবর মূলত ইরানের পশ্চিমাঞ্চল থেকে এলেও শনিবার রাজধানী তেহরানের চিত্র তুলনামূলক শান্ত ছিল। সরকারি ছুটি এবং বৃষ্টি ও তুষারপাতের কারণে অনেক সড়কই ফাঁকা দেখা গেছে।
এম এম সি/










