সত্তরের দশকের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচাইতে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইরান। একদিকে অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভে বিপর্যস্ত শাসনব্যবস্থা, অন্যদিকে মার্কিন সামরিক হামলার ক্রমবর্ধমান আশঙ্কা—এই দুই সংকটে দাঁড়িয়ে নিজেদের আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে এখন কেবলই যুদ্ধের মেঘ।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার একটি তালিকা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জমা দিয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দাবি করেছে। ইরান ইস্যুতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি ট্রাম্প আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা ও কর্মীদের আংশিক সরিয়ে নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সাথে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করেছে ওয়াশিংটন।
ইরানের বর্তমান অস্থিরতার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক দুরবস্থা, যা এখন সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। রাজপথের এই আন্দোলন দমাতে তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিক্ষোভ দমনে বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যারা রাজপথে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগে জড়িত, তাদের দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিলম্বিত হলে তার কার্যকারিতা থাকে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এর মধ্যেই এক নাটকীয় বার্তায় ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান সম্ভবত বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।
ইরান কেবল নিজেদের সুরক্ষাই নিশ্চিত করেনি, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোকেও কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে। তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের ভূখণ্ড বা আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা চালানো হলে ওই সব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানবে তেহরান। এই হুমকির পরপরই রিয়াদ কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশপথ ব্যবহার করে ইরানে কোনো হামলা করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে সংঘাত এড়াতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সীমিত কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল, তা এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যকার পূর্বনির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটনের অনবরত সামরিক হুমকির মুখে আলোচনার পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই।
ইরান ইস্যু এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। জার্মানির বার্লিনে হাজার হাজার প্রবাসী ইরানি রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে, তেহরানে ব্রিটিশ দূতাবাসের বাইরে এক বিশাল সমাবেশে সরকার সমর্থকরা জমায়েত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে। মার্কিন হামলার আশঙ্কা এবং ইরানের অনড় অবস্থান অঞ্চলটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা।
-এম. এইচ. মামুন










