মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী উত্তেজনা: বিএনপি প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হুমকি

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতাকে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিহত করার হুমকির অভিযোগ উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থী আতাউর রহমান আতার ভাতিজি জামাই জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আফরোজা খানম রিতাকে জড়িয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।

গত ১২ জানুয়ারি রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার পর এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এসব মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীর হোসেন। ওই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

ভিডিওতে জাহাঙ্গীর হোসেনকে বলতে শোনা যায়, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের ‘বহিরাগত’ আফরোজা খানম রিতা নাকি নিজের প্রভাব খাটিয়ে আতাউর রহমান আতার মনোনয়ন বাতিল করিয়েছিলেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, “কোন বহিরাগত, কোন রোহিঙ্গার জায়গা মানিকগঞ্জে হবে না।”

তবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আতাউর রহমান আতার মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনগত। মানিকগঞ্জ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা যাচাই-বাছাই শেষে মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন। পরবর্তীতে আপিলের পর নির্বাচন কমিশন সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের একক ক্ষমতা রিটার্নিং কর্মকর্তার। কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে অন্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। ফলে আফরোজা খানম রিতাকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করার অভিযোগ আইনগতভাবে ভিত্তিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা ও তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এ ধরনের বক্তব্য সরাসরি হুমকির শামিল। এতে ভোটারদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি একজন নারী প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দেওয়া শুধু অসদাচরণই নয়, এটি মানহানিকর ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য।

আইনজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী সময় এমন বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ভয়ভীতি, হুমকি বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ভোটার বা প্রার্থীকে বাধাগ্রস্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নির্বাচনী আচরণবিধিমালায়ও অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত, বিদ্বেষমূলক বা উসকানিমূলক বক্তব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তাঁরা আরও বলছেন, কাউকে অপমানসূচকভাবে ‘রোহিঙ্গা’ বলা শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; এটি একটি নির্যাতিত ও আশ্রয়প্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিও অবমাননাকর। দণ্ডবিধি অনুযায়ী এ ধরনের বক্তব্য মানহানি ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশের জন্য হুমকি। বক্তব্যদাতা সরাসরি প্রার্থী না হলেও তিনি যদি প্রার্থীর ঘনিষ্ঠজন হন এবং প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে আচরণবিধির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে ‘বহিরাগত’ ও ‘রোহিঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে হুমকি এবং মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগ নির্বাচনী আচরণবিধি ও প্রচলিত আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা এখন অত্যন্ত জরুরি।

 

অভি হাসান ,মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি,