উন্নয়নের গ্রাফের নিচে চাপা পড়ে থাকা মাজেদার জীবন

জাতীয় পর্যায়ে উন্নয়নের সূচক বাড়ছে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, দারিদ্র্য কমার গ্রাফ দেখানো হচ্ছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে বহু মানুষের জীবন। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের বেলছড়ি গ্রামের মাজেদা তাদেরই একজন যার জীবনে উন্নয়ন এখনো কেবল শোনা গল্প।

৩৫ বছর বয়সী মাজেদার কোনো নিজস্ব ঘর নেই। অসুস্থ স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি বছরের পর বছর অন্যের ঘরে, অন্যের জমিতে, অন্যের দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। তার জীবন যেন রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা এক বাস্তবতা।

স্থানীয়ভাবে জানা যায়, মাজেদার জন্মই হয়েছিল দারিদ্র্যের মধ্যে। তিন বোন ও চার ভাইয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা এই নারী ছোটবেলা থেকেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে পরিচিত। জীবিকার চাপে তার বাবা একসময় পৈতৃক ভিটেমাটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। এরপর পরিবার নিয়ে আশ্রয় নেন নদীর পাড়ে অন্যের জমিতে। সেখানে শাক-সবজি চাষ করেই কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা চলত।

বিয়ে মাজেদার জীবনে স্থিতি আনেনি। নোয়াখালীর এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হলেও সংসার শুরুর পর থেকেই দারিদ্র্য ও অসুস্থতা তাকে ঘিরে ধরে। স্বামীর শারীরিক অসুস্থতা পরিবারের বোঝা আরও বাড়ায়। ফলে বাবার বাড়িতেও স্থায়ী আশ্রয় মেলেনি। কখনো পরিত্যক্ত ঘর, কখনো অস্থায়ী কুঁড়েঘর এভাবেই চলেছে তার দিন।

বর্তমানে যে ঘরে মাজেদা বসবাস করছেন, সেটি আধুনিক উন্নয়ন ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। একটি মাত্র ঘরে রান্না, বসবাস ও পশুপালন সবকিছু একসঙ্গে। বিদ্যুৎ নেই, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই, নেই স্যানিটেশন সুবিধা। এই ঘর যেন সময়ের সঙ্গে এগোয়নি; বরং থমকে আছে বহু দশক আগের এক বাস্তবতায়।

অর্থের অভাবে মাজেদা তার সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারেননি। চিকিৎসা করাতে না পারায় অসুস্থ স্বামী ও শিশুদের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য যেগুলোকে রাষ্ট্র মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে তা তার জীবনে কেবল স্বপ্নই রয়ে গেছে।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারি সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও প্রকৃত প্রান্তিকদের কাছে তা অনেক সময় পৌঁছায় না। রাজনৈতিক পরিচয়, তথ্যের অভাব কিংবা প্রশাসনিক জটিলতায় মাজেদার মতো মানুষ তালিকার বাইরে থেকে যান।

মাজেদার জীবন প্রশ্ন তোলে উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে। উন্নয়ন যদি কেবল পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে, আর বাস্তবে কেউ মাথা গোঁজার ঠাঁই না পায় তবে সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক।

মোঃ লোকমান হোসেন, খাগড়াছড়ি