ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরান সরকারের রক্তক্ষয়ী দমনপীড়নের জেরে তিনি দেশটির ওপর হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরান আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যুক্ত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দল ইরানের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা এবং সরাসরি মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলাসহ বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন।
রোববার (স্থানীয় সময়) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “সামরিক বাহিনী বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং আমরা অত্যন্ত কঠোর কিছু পদক্ষেপের কথা ভাবছি।” ইরানের প্রতিশোধের হুমকির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তারা যদি এমন কিছু করে, তবে আমরা তাদের ওপর এমন মাত্রায় আঘাত হানব যা তারা আগে কখনও দেখেনি।”
ট্রাম্প আরও জানান, তাঁর প্রশাসন তেহরানের সঙ্গে একটি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানে নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা অব্যাহত থাকায় বৈঠকের আগেই হয়তো তাঁকে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয় তারা যুক্তরাষ্ট্রের হাতে মার খেতে খেতে ক্লান্ত। ইরান এখন আলোচনা করতে চায়।” তিনি আরও যোগ করেন, “বৈঠকের আয়োজন চলছে, কিন্তু সেখানে যা ঘটছে তার কারণে বৈঠকের আগেই হয়তো আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। ইরান যোগাযোগ করেছে, তারা আলোচনা করতে চায়।”
ইরানের পক্ষ থেকে বৈঠকের এই প্রস্তাবের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। এদিকে, পেন্টাগন এবং ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারীদের জন্য ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিশাল মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিষয়টিও বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে যে, বিক্ষোভকারীদের সুরক্ষায় আমেরিকা শক্তি প্রয়োগ করলে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েল ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’তে পরিণত হবে। এর মধ্যেই ট্রাম্প দাবি করলেন যে, ইরান নিজেরাই যোগাযোগ করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি’ (HRANA) জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে ১০,৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। সংস্থাটি বিগত বছরগুলোর অস্থিরতায় সঠিক তথ্য দেওয়ার জন্য পরিচিত। তাদের তথ্যমতে, নিহতদের মধ্যে ৪৯৬ জন বিক্ষোভকারী এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তারা ইরানের ভেতরের সমর্থকদের মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে থাকে।
ইরানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এবং ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন থাকায় বিদেশ থেকে বিক্ষোভের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) স্বাধীনভাবে নিহতের সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি। ইরান সরকারও হতাহতের কোনো সামগ্রিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
বহির্বিশ্বের পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, এই তথ্য ব্ল্যাকআউট ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর কট্টরপন্থীদের আরও রক্তক্ষয়ী দমনপীড়ন চালাতে উৎসাহিত করতে পারে। শনিবার রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত রাজধানী তেহরান এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসে। অনলাইন ভিডিওগুলোতে রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত আরও বিক্ষোভের চিত্র উঠে এসেছে, যা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তেহরানের এক কর্মকর্তা স্বীকারও করেছেন।
পার্লামেন্টে ক্ষোভ ও হুমকি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে হামলার হুমকিটি এসেছে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের কাছ থেকে। কট্টরপন্থী এই নেতা অতীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও লড়েছেন। পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি ইসরায়েলকে সরাসরি হুমকি দিয়ে একে ‘অধিকৃত ভূখণ্ড’ বলে অভিহিত করেন।
গালিবাফ বলেন, “ইরানে হামলার ঘটনা ঘটলে, অধিকৃত ভূখণ্ড (ইসরায়েল) এবং এই অঞ্চলে থাকা আমেরিকার সমস্ত সামরিক কেন্দ্র, ঘাঁটি এবং জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে। আমরা কেবল হামলার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখব না, বরং হুমকির কোনো বস্তুনিষ্ঠ লক্ষণ দেখলেই আমরা ব্যবস্থা নেব।”
এ সময় আইনপ্রণেতারা পার্লামেন্টের ডায়াসের দিকে ছুটে যান এবং “আমেরিকার মৃত্যু হোক!” বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর, দেশটি আসলে কতটা গুরুতর হামলা চালাতে সক্ষম তা অস্পষ্ট। যুদ্ধে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর নির্ভর করবে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বাহিনী, অংশীদার, মিত্র এবং মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় তারা পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। জুনে ইরান কাতারের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল। এছাড়া বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম নৌবহর মোতায়েন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরিস্থিতি “নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে। তিনি আরও জানান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।
নেতানিয়াহু বলেছেন, “ইসরায়েলের জনগণ এবং সমগ্র বিশ্ব ইরানের নাগরিকদের অসাধারণ বীরত্ব দেখে মুগ্ধ।”
ভ্যাটিকানে পোপ লিও চতুর্দশ ইরানকে এমন একটি স্থান হিসেবে উল্লেখ করেছেন “যেখানে চলমান উত্তেজনা বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, “সমগ্র সমাজের মঙ্গলের জন্য ধৈর্য সহকারে সংলাপ ও শান্তির পথ অনুসরণ করা হবে।”
বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে বিশ্বের কিছু রাজধানীতেও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার ফলে “অসংখ্য মৃত্যুর” খবরে মহাসচিব “স্তম্ভিত” হয়েছেন। তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তেহরান ও মাশহাদে বিক্ষোভ
স্টারলিংক স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে ইরান থেকে পাঠানো অনলাইন ভিডিওতে দেখা গেছে, উত্তর তেহরানের পুনাক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছে। সেখানে কর্তৃপক্ষ রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে বলে মনে হয়েছে, আর বিক্ষোভকারীরা তাদের মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে আন্দোলন করছে। কেউ কেউ ধাতব বস্তুতে আঘাত করে শব্দ করছে এবং আতশবাজি ফোটানো হচ্ছে।
তেহরান থেকে প্রায় ৭২৫ কিলোমিটার (৪৫০ মাইল) উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদেও বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছে বলে ফুটেজে দেখা গেছে। তেহরান থেকে ৮০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে কেরমানেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিভিন্ন শহরে তাদের সংবাদদাতাদের শান্ত পরিস্থিতির চিত্র দেখাতে উপস্থিত করেছিল, যেখানে পর্দায় তারিখ ও সময় দেখা যাচ্ছিল। তবে তেহরান এবং মাশহাদ সেই তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) দরপতনের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর এই বিক্ষোভ শুরু হয়। বর্তমানে ১ ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান ১৪ লাখেরও বেশি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি চরম সংকটে পড়েছে, যা মূলত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আরোপিত হয়েছে। সেই বিক্ষোভ এখন তীব্রতর হয়ে ইরানের ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এপি নিউজ থেকে অনূদিত










