রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে মানবিকতার স্পন্দন: স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্তদের সঙ্গে সচিবের আড্ডা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ির ঐতিহাসিক বকুলতলা শনিবার এক ব্যতিক্রমী ও মানবিক আড্ডার সাক্ষী হলো। যেখানে একদিকে ছিলেন ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ারে বসা ১৭ জন স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, আর অন্যদিকে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের কথা শুনছিলেন দেশের প্রথম নারী শিক্ষা সচিব রেহেনা পারভীনসহ সমাজের বিশিষ্টজনেরা।

স্বপ্ন, গান আর আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধন
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ড. নাসের ফাউন্ডেশনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অংশ নেন। হাঁটাচলার শক্তি না থাকলেও তাদের চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাস, সাহস আর জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসার ছাপ। গান, হাসি, আড্ডা আর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।

তাদের কথা শুনতে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুর ভিজিটিং রিসার্চ স্কলার ড. এ কে এম গোলাম হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দুই সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রজ্জাক ও হারুন অর রশিদ।

দুর্ঘটনা কেড়েছে পা, কেড়ে নিতে পারেনি স্বপ্ন
আড্ডায় অংশ নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকেই। যদুবয়রা ইউনিয়নের রাজু আহমেদ জানান, ২০০২ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় তিনি চিরতরে হাঁটার ক্ষমতা হারান। এরপর স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। এখন অসুস্থ মাকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।

চাপড়া ইউনিয়নের শামিম আহমেদ বলেন, “এত বড় পর্যায়ের মানুষ আমাদের ডেকে এভাবে সম্মান জানাবে, কোনোদিন ভাবিনি। একটি দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে আছি। কিন্তু এখানে এসে মনে হয়েছে, আমরাও কিছু করতে পারি।”

আরেক অংশগ্রহণকারী শহিদুল ইসলাম বলেন, “এভাবে কেউ আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখায়নি। ড. নাসের ফাউন্ডেশনের দেখানো পথে যদি এগোতে পারি, তাহলে আমরাও পরিবার ও দেশের জন্য কাজ করতে পারব।”

সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের গুরুত্ব
ড. নাসের ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. আবু নাসের (যুক্তরাষ্ট্রের বেকার্সফিল্ড ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপার্সন) জানান, তার সংগঠনটি ২০০০ সাল থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

এই মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব রেহানা পারভীন বলেন, “দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে আরও উদ্যোমী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবন্ধীরা আমাদের বোঝা নয়, তারা আমাদের সম্ভাবনার শক্তি।”

দুপুরে সবাই একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই মানবিক মিলনমেলার সমাপ্তি ঘটে, যা রেখে যায় একরাশ অনুপ্রেরণা ও ভালোবাসার বার্তা।