৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেন ট্রাম্প: কী করবে ভারত?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির রাজনীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবার সেই হুমকির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ড। রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের পণ্যের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্ক নতুন করে চাপে পড়ল।

‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’ কী?

এই শুল্ক আরোপের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত একটি আইন—‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’। বিলটি কংগ্রেসে উত্থাপনের অনুমোদন পেলেও এখনো ভোটাভুটি হয়নি। এটি পাস হলে রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারবে। ভারত ও চীন এই তালিকার শীর্ষে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক এবং সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল। ফলে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫০ শতাংশে। তাতেই যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ৫০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে কার্যত মার্কিন বাজারে ভারতের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে।

ট্রাম্পের বক্তব্য: আইন নয়, সিদ্ধান্ত আমার

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমার নিজের নৈতিকতা “আমার মন” এটাই একমাত্র জিনিস যা আমাকে থামাতে পারে।” আন্তর্জাতিক আইন মানা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “আমি মানি, তবে সিদ্ধান্ত আমিই নেব।”

এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক কৌশলকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন ট্রাম্প।

ভারতের অবস্থান কী?

এর আগেও ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাবে ভারত পশ্চিমা বিশ্বের ‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ তুলেছিল। ভারতের যুক্তি,যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিজেরাও রাশিয়ার সঙ্গে বিভিন্ন খাতে বাণিজ্য করছে। তবে বাস্তবতায় ভারত ধীরে ধীরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমিয়েছে।

রয়টার্স জানায়, জানুয়ারি মাসে ভারতের রাশিয়া থেকে তেল আমদানি এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনের তুলনায় ডিসেম্বরে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি কমেছে ৪০ শতাংশ।

রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজও জানিয়েছে, জানুয়ারিতে তারা রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল পাওয়ার আশা করছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৪ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে—যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিপরীতে রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানি মাত্র ৪ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার।
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের (জিটিআরআই) প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, “৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এই বিল কংগ্রেসে পাস হওয়া কঠিন।”

চীনের দিকে ঝুঁকছে ভারত?

যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে। জিটিআরআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে চীনে ভারতের রপ্তানি ৯০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২০ কোটি ডলারে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি এখনো কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং কাঠামোগতভাবে দুর্বল।

বৃহত্তর জোট ও ব্রিকস বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের লাগামহীন চাপই রাশিয়া, চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোকে এক ছাতার নিচে আনছে। ব্রিকস জোট বর্তমানে বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৩২ শতাংশ জোগান দেয়।
দ্য হিন্দুর আন্তর্জাতিক সম্পাদক স্ট্যানলি জনি লিখেছেন, “শুধু শক্তির ভারসাম্য নয়, হুমকির মুখেও জোট গড়ে ওঠে।”

৫০০ শতাংশ শুল্ক: বাস্তব না কৌশল?

ভারতের অনন্ত সেন্টার থিঙ্কট্যাংকের সিইও ইন্দ্রাণী বাগচীর মতে, “এই শুল্ক হুমকি মূলত রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরির কৌশল। তাঁর ভাষায়, বিল পাস হলেও প্রেসিডেন্টের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকায় এই শুল্ক কার্যকর হলেও ভারত বা রাশিয়ার বড় ক্ষতি নাও হতে পারে।

সামনে কী?

সব মিলিয়ে ভারত এখন এক কৌশলগত সন্ধিক্ষণে। রাশিয়ার সস্তা তেল বনাম যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বাজার—এই দুইয়ের মাঝেই ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে দিল্লিকে। তবে এক বিষয় স্পষ্ট—গত এক বছরে ভারত–মার্কিন সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে ‘আইসিইউতে’ থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

-এমইউএম/