দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশজুড়ে আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। থানা পুলিশ, ডিবি এবং র্যাবের দীর্ঘ ব্যর্থতার পর সর্বশেষ গঠিত উচ্চ পর্যায়ের ‘টাস্কফোর্স’ ১৫ মাস পার করলেও তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে এখন কেবল বুকফাটা আর্তনাদ আর হতাশা নিয়ে দিন কাটছে নিহতের পরিবারগুলোর।
১২৩ বার সময় বৃদ্ধি ও টাস্কফোর্সের স্থবিরতাঃ ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হন এই দম্পতি। এরপর থেকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত থেকে ১২৩ বার সময় নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের নির্দেশে পিবিআই প্রধানের নেতৃত্বে র্যাব, সিআইডি ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
টাস্কফোর্সের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল জানান, তারা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করছেন। প্রযুক্তির সহায়তায় তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ঘাতকরা জানালার গ্রিল ভেঙেই ভেতরে প্রবেশ করেছিল। তবে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িতদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত এই রহস্য তিমিরেই থেকে যাচ্ছে।
জরাজীর্ণ ঘরে বিচারের অপেক্ষাঃ পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে সাগরের পৈত্রিক নিবাসে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। একমাত্র ছেলে ও পুত্রবধূর ছবি হাতে এখনো বিলাপ করছেন সাগরের বৃদ্ধা মা সালেহা মনির। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “১৪ বছরেও খুনিরা ধরা পড়ল না। মা হিসেবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমার কলিজার টুকরা সাগর হত্যার বিচার চেয়ে যাব।”
সাগরের বাবা মনির হোসেন মারা গেছেন ২০০৪ সালে। সাগর চেয়েছিলেন রাজউক থেকে প্ল্যান পাশ করে জরাজীর্ণ বাড়িটি নতুন করে গড়বেন। মা’কে কথা দিয়েছিলেন, ডয়চে ভেলে থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে নতুন ঘর তুলবেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম আঘাতে সেই স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। বর্তমানে সেই ভাঙাচোরা ঘরে বৃষ্টির পানি জমে মানবেতর জীবন যাপন করছেন সালেহা মনির।
তদন্তের দীর্ঘ পথ ও ব্যর্থতাঃ সাগর-রুনি হত্যার পর প্রথমে শেরে বাংলা নগর থানা, পরে ডিবি এবং সবশেষে দীর্ঘ ১১ বছর র্যাব তদন্ত চালিয়েছে। র্যাব ২১ জনের ডিএনএ নমুনা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে পরীক্ষা করলেও সন্দেহভাজন কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। আলোচিত এই মামলায় দীর্ঘ সময়েও তদন্তের কোনো কিনারা না হওয়াকে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ বলে মনে করছেন নিহতের ভাই ও মামলার বাদী নওশের আলম রোমান। তিনি বলেন, “মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। আদৌ বিচার হবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান।”
সাগর-রুনি যখন খুন হন, তখন তাদের একমাত্র সন্তান মেঘের বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। আজ ১৯ বছরের তরুণ মেঘ বড় হয়েছে বিচারের অপেক্ষা আর মা-বাবার স্মৃতি নিয়ে। দেশের অনেক জটিল ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উন্মোচিত হলেও সাগর-রুনি মামলার ক্ষেত্রে কেন এই স্থবিরতা—এ প্রশ্ন এখন সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের। আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি এই কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে, অথচ তদন্তের ফল এখনো শূন্য।
উল্লেখ্য ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টিভির বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি অত্যন্ত নৃশংসভাবে খুন হন।
-এম. এইচ. মামুন










