ঝিনাইদহ জেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট। জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার পাঁচটি সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনটির কোনো মজুত নেই। এমনকি বেসরকারি ফার্মেসিতেও পাওয়া যাচ্ছে না এই জীবনরক্ষাকারী টিকা। ফলে রোগীরা বাধ্য হয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে শরীরে প্রয়োগ করছেন। তবে কবে নাগাদ সংকট কাটবে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান—কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, একটি ভায়াল র্যাবিস ভ্যাকসিন সাধারণত চারজন রোগীর জন্য ব্যবহারযোগ্য। কুকুর বা বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়া জরুরি। মাংসপেশিতে প্রয়োগ করলে চার ডোজে এবং চামড়ার নিচে প্রয়োগ করলে তিন ডোজে টিকাদান সম্পন্ন হয়। জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হলে কার্যকর কোনো চিকিৎসা নেই এবং এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু প্রায় অনিবার্য—যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন রোগী কুকুর ও বিড়ালের কামড় বা আঁচড় নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। সাধারণত এসব রোগীর শরীরে র্যাবিস ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। তবে গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালের ভ্যাকসিনের মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বেসরকারি ভ্যাকসিনের ওপর চাপ বেড়ে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জেলায় সামগ্রিক সংকট তৈরি হয়। গত মাসেই ফার্মেসিগুলোর মজুতও ফুরিয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার শুধু সদর হাসপাতাল থেকেই ভ্যাকসিন না পেয়ে অন্তত ৪০ জন রোগী ফিরে গেছেন। একই দিনে ৫২ জন রোগী পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে শরীরে প্রয়োগ করেন।
শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টানা ১৫ দিন ধরে র্যাবিস ভ্যাকসিন নেই। একই অবস্থা কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, হরিণাকুণ্ডু ও কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও। জেলা শহরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজারের ফার্মেসিতেও ভ্যাকসিনের দেখা নেই। কোনো কোনো দোকানে সীমিত পরিমাণ থাকলেও তা গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোগীরা জানান, কেউ অনলাইনে অর্ডার দিয়ে, কেউ মাগুরা, কুষ্টিয়া, খুলনা কিংবা সাতক্ষীরার মতো জেলায় গিয়ে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করছেন। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয় ও ভোগান্তির পাশাপাশি সময়মতো টিকা না পেয়ে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কবে নাগাদ নতুন করে ভ্যাকসিন বরাদ্দ পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে তারা অবগত নন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জরুরি পদক্ষেপ না নিলে দ্রুত সংকট নিরসনের সম্ভাবনাও কম বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
বেসরকারি খাতে ইনসেপ্টা ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস র্যাবিস ভ্যাকসিন উৎপাদন করে। তবে হঠাৎ করে সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারাও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
ভুক্তভোগী রোগীদের একজন অপূর্ব কুমার জানান, তাঁর সাত মাসের সন্তানকে বিড়ালে আঁচড় দেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন প্রয়োজন হলেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোথাও পাননি। একইভাবে, সাত বছরের শিশু মারুফকে কুকুরে কামড়ানোর পর তার পরিবারকে অন্য জেলা থেকে ভ্যাকসিন এনে শেয়ার করে দিতে হয়েছে।
সদর হাসপাতালের টিকাদান কক্ষের কর্মী উমায়ের হোসেন জানান, সরকারিভাবে ভ্যাকসিন না থাকায় বাইরে থেকে কিনে আনতে পারলে তবেই রোগীদের শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এস এম আশরাফুজ্জামান সজীব বলেন, কয়েক দিন আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভ্যাকসিনের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে জানুয়ারি মাসেও সরবরাহ পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান জানান, জেলা জুড়েই ভ্যাকসিনের সংকট চলছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে।
আফরিনা সুলতানা/










