দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্থবিরতার মেঘ কাটতে শুরু করেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি পূরণ না হলেও মাত্র এক মাস পরেই অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অর্থনীতিতে বইছে আশার সুবাতাস। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে নীতিগত স্থিতিশীলতা ফিরবে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে।
খারাপের মধ্যেও ভালো খবর: রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি
অর্থনীতির কঠিন সময়ে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের বাজারে চাপ কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২.৪৪ বিলিয়ন ডলার।
বিনিয়োগের অপেক্ষায় উদ্যোক্তারা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘অপেক্ষা করো ও দেখো’ নীতিতে থাকা অনেক বিনিয়োগকারী এখন ধীরে ধীরে সক্রিয় হচ্ছেন। তারা আশা করছেন, একটি নির্বাচিত সরকার এলে পাঁচ থেকে দশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে, যা বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে পেরেছে। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে এবং বিনিয়োগ আসছে না। নির্বাচিত সরকার এলে বিনিয়োগের এই স্থবিরতা কাটতে পারে, কারণ বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চান।”
অর্থনীতিতে গতির আভাস
আসন্ন নির্বাচন ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিবাচক মনোভাবের প্রতিফলন দেখা গেছে সর্বশেষ পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) সূচকেও। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই সূচক সামান্য বেড়ে ৫৪.২-এ দাঁড়িয়েছে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়। কৃষি ও উৎপাদন খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নির্মাণ খাতে এখনো চাপ রয়েছে।
সামনের বড় চ্যালেঞ্জ
তবে এই আশার আলোর পেছনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। রপ্তানি খাতে এখনো স্থবিরতা কাটেনি, টানা পাঁচ মাস ধরে আয় কমছে। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও মাত্র ৬.২৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা শিল্পায়নের ধীরগতি নির্দেশ করে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম-এর মতে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে না।
আস্থাই মূল চাবিকাঠি
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও প্রধান কাজ হবে বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ফেরানো। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি কমানো এবং ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের সংস্কার।”
সব মিলিয়ে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি সরকার দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অর্থনীতির এই আশার আলো বাস্তব গতি পেতে পারে এবং স্থবিরতা কাটিয়ে দেশ আবারও উন্নয়নের ধারায় ফিরতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
-আফরিনা










