অর্থ সংকটে থমকে যাচ্ছে মেগা প্রকল্প, ১০ প্রকল্পের ৮ টির বরাদ্দে বড় কাটছাঁট

অন্তর্বর্তী সরকারের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটছে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি)। পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত ব্যয়বহুল ও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বদলে বর্তমান সরকার জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে গুরুত্বারোপ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০টি প্রধান মেগা প্রকল্পের ৮টিতেই বড় ধরনের বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

আগামী সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার মূল এডিপি থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ২ লাখ কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি অনুমোদন হতে পারে।

মেট্রোরেল স্বপ্নে ‘ব্রেক’: এমআরটি-১ এ ৯১ শতাংশ ছাঁটাইঃ চলতি অর্থবছরের আরএডিপি খসড়ায় সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোতে। বিশেষ করে দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প ‘এমআরটি লাইন-১’-এর বরাদ্দ ৯১ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার বরাদ্দ থেকে কমিয়ে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হেমায়েতপুর-ভাটারা রুটের এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) এর বরাদ্দ ৬০ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৬ এর বরাদ্দ ২৪ শতাংশ কমানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টেন্ডার জটিলতা, বৈদেশিক ঋণের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং অতিমূল্যায়িত ব্যয়ের কারণে এই ছাঁটাই জরুরি হয়ে পড়েছিল।

সারণিতে খাতভিত্তিক বরাদ্দের চিত্র ও কাটছাঁট-

প্রকল্পের নাম মূল বরাদ্দ (কোটি টাকা) প্রস্তাবিত বরাদ্দ (কোটি টাকা) হ্রাসের হার (%)
এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) ৮,৬৩১ ৮০১ ৯১%
বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প ১,০৩৯ ৩০৬ ৭১%
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ৪,০৬৮ ১,০৮৫ ৭৩%
বিআরটি (গাজীপুর-ঢাকা) ৪২৫ ১৬৯ ৬০%
এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) ১,৪৯০ ৫৯২ ৬০%

 

ব্যতিক্রম রূপপুর ও আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়েঃ সরকার সব প্রকল্প ছোট করলেও কৌশলগত কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১০ হাজার ১১ কোটি টাকার বরাদ্দ অপরিবর্তিত রেখেছে। অন্যদিকে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ১,১৩৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ার সাথে ঢাকার যোগাযোগ সচল রাখা এবং তৈরি পোশাক খাতের পরিবহণ গতি বাড়াতেই এই অতিরিক্ত বরাদ্দ।

বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণঃ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে দেখছেন সতর্কতার সাথে। তিনি বলেন, “অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পের বরাদ্দ কমানো শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ক্ষতির কারণ হতে পারে। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে, আবার ভবিষ্যতে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়লে প্রকল্প ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। অথচ আমাদের মাথায় ঋণের বোঝা দিন দিন বাড়ছে।”

কৃচ্ছ্রসাধন ও যৌক্তিকীকরণে সরকারের অবস্থানঃ পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনেক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল যার কোনো সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার এখন প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় ও উপযোগিতা পুনর্বিবেচনা করছে। এছাড়া ডলার সংকটের কারণে অনেক বিদেশি ঠিকাদার কাজ গুটিয়ে নেওয়ায় এবং লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ায় বরাদ্দ কমানো ছাড়া উপায় নেই।

বড় বাজেটের মেগা প্রকল্প থেকে সরে এসে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতে গুরুত্ব দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও, বর্তমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে কিছুটা ধীরগতি আনতে পারে। আগামী সোমবারের এনইসি বৈঠকে এনইসি চেয়ারপারসন অধ্যাপক ইউনূস এই কাটছাঁটের চূড়ান্ত রূপরেখা দেবেন, যা আগামী নির্বাচন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বড় সিগনাল হিসেবে কাজ করবে।

 

এম. এইচ. মামুন