ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশি এখন উত্তপ্ত। ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল পরিবহনে অভিযুক্ত একটি জাহাজকে কেন্দ্র করে সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘নৌ অবরোধ’ কার্যকর করতে যখন মার্কিন বাহিনী জাহাজটি জব্দের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই জাহাজটির পাহারায় নৌবাহিনী মোতায়েন করে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে ক্রেমলিন।

মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রমতে, ‘বেলা ১’ নামের এই জাহাজটি গত মাসে ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন কোস্টগার্ডের তল্লাশি এড়াতে নাটকীয়ভাবে পথ পরিবর্তন করে। আইনি জটিলতা এড়াতে জাহাজটি রাতারাতি নাম বদলে রাখে ‘মারিনেরা’ এবং গায়ানার পতাকা নামিয়ে রাশিয়ার পতাকা উত্তোলন করে। বর্তমানে এটি স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধে ‘নৌ অবরোধ’ দেওয়া হবে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই গত শনিবার ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। ট্রাম্পের দাবি, এসব জাহাজ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার ও ইরানের তেল পরিবহন করা হচ্ছে।

সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, জাহাজটি জব্দ করতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০টি সামরিক পরিবহন বিমান ও বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার ওই অঞ্চলে পৌঁছেছে। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিষেধাজ্ঞাভুক্ত জাহাজ ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে তারা প্রস্তুত।

অন্যদিকে, রাশিয়া বিষয়টিকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে জাহাজটির সুরক্ষায় নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, জাহাজটি আন্তর্জাতিক আইন মেনেই রাশিয়ার পতাকা নিয়ে চলাচল করছে। তাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ নৌ-চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো অন্যায্য নজরদারি চালাচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতে স্কটল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের মধ্যবর্তী এলাকায় আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় মার্কিন বাহিনীর পক্ষে জাহাজটিতে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার চেয়ে জব্দ করতেই বেশি আগ্রহী। তবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ার পতাকা উড়িয়ে চলা একটি জাহাজে মার্কিন বাহিনীর বলপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন কি না—তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

মেরিটাইম গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর বিশ্লেষক দিমিত্রিস আমপাতজিদিস জানান, জাহাজের নাম বা পতাকা বদলালেও এর আন্তর্জাতিক নিবন্ধন নম্বর (IMO) একই থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাহাজটির পরিচয় লুকানো প্রায় অসম্ভব। তবে রাশিয়া এই জাহাজটিকে সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়ায় পরিস্থিতি এখন আর কেবল আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক শক্তিমত্তার পরীক্ষায় রূপ নিয়েছে।

নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, আটলান্টিকের এই ঘটনা তাতে ঘি ঢেলে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও ওয়াশিংটন ও মস্কোর এই স্নায়ুযুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

-এম. এইচ. মামুন