হত্যা, ডাকাতি, মব সন্ত্রাস বেড়েছে: বছরে ৪ হাজার হত্যা মামলা, গণপিটুনিতে নিহত ১৬৮

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে হত্যা, ডাকাতি, দস্যুতা এবং মব সন্ত্রাসের মতো গুরুতর অপরাধ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক বছরে দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন এবং গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ও পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতিতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অপরাধীদের দৌরাত্ম্য এবং আইনের শাসনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের চিত্র
বিশেষ করে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা জনমনে বাড়তি আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সর্বশেষ গত সোমবার যশোরের মণিরামপুরে ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। একই দিন চট্টগ্রামের রাউজানে সাবেক এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন নরসিংদীতে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রায়শই এসব ঘটনায় হামলাকারীরা অধরা থেকে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
পুলিশ সদর দপ্তর: পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে প্রায় চার হাজার হত্যা মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ১১ মাসেই দায়ের হয়েছে ৩,৫০৯টি হত্যা মামলা। হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনায় গত ১৩ মাসে (আগস্ট ২০২৪ – আগস্ট ২০২৫) মোট ৩৯,৯৩৬টি মামলা হয়েছে, যা এর আগের ১৩ মাসের তুলনায় ৩,০২১টি বেশি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS): মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে:

  • রাজনৈতিক সহিংসতা: ৯১৪টি ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ৭,৫১১ জন আহত হয়েছেন।

  • মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনি: ২৯২টি ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।

  • সাংবাদিক নির্যাতন: ৩১৮টি হামলায় ৩ জন সাংবাদিক নিহতসহ মোট ৫৩৯ জন হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

  • বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: পুলিশি হেফাজতে, নির্যাতন বা কথিত বন্দুকযুদ্ধে মোট ৪০ জন নিহত হয়েছেন।

  • নারী ও শিশু নির্যাতন: ৮২৮টি ধর্ষণসহ মোট ২,০৪৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

  • শ্রমিক নির্যাতন: ৩৫৯টি ঘটনায় ৯৬ জন শ্রমিক নিহত এবং ১,০২১ জন আহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ ও সরকারের বক্তব্য
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি; বরং পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আমরা যে ধরনের একটি নির্বাচন উপযোগী পরিবেশ এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে যে ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশা করছি, সেটা তৈরি হচ্ছে না। অভিযান চালিয়ে অনেক অপরাধী গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও গুরুতর অপরাধ যারা সংঘটিত করছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।”

এদিকে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম সারা দেশে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখা এবং থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

এইচআরএসএস-এর নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।”

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।