হয়রানির অভিযোগ: অপারেশন ডেভিল হান্ট ঘিরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দেশব্যাপী ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ ও ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ নামে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে সরকার। তবে এই অভিযানের আড়ালে রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের অভিযোগ উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী ৫২০ দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় সারা দেশে মোট ৮৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম দফার ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ ২২ দিনে ১২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ‘ফেইজ-২’ অভিযানে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৬৯ জনকে। দুই দফার এই বিশেষ অভিযানে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২৭ হাজার ৬৯ জন।
এর বাইরে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পরবর্তী বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্ট ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আরও ৬০ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজারে। এই অভিযানে ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলি, গ্রেনেড ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
অভিযোগ উঠেছে, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ঢালাওভাবে সমর্থকদেরও ধরা হচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মী বা রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষকেও ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জের চুনারঘাটে ৫৫ বছর ধরে সংবাদপত্র বিক্রি করা সত্তরোর্ধ্ব রায় রঞ্জন পালকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকলেও কেবল ‘আওয়ামী সমর্থক’ সন্দেহে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিনে মাধবপুর থেকে সাংবাদিক শংকর পাল সুমনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেককে অজ্ঞাতনামা আসামির তালিকায় ঢুকিয়ে ‘গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ করা হচ্ছে, যা জনমনে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করছে।
তবে ঢালাও গ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষা করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “যারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে বাহিনীগুলো সতর্ক থাকবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে বা দেশের বাইরে থাকায় এখন নিচুতলার সমর্থকদের ওপর খড়্গ নেমে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য যাচাই-বাছাই না করে এভাবে ঢালাও গ্রেপ্তার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও জনগণের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
-লামিয়া আক্তার