জোহরান মামদানির এই “নতুন গল্প” মূলত নিউইয়র্ককে মুষ্টিমেয় ধনীদের শহর থেকে সাধারণ মানুষের শহরে রূপান্তর করার একটি প্রচেষ্টা। মেয়র নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ পুরো নিউইয়র্কের প্রগতিশীল রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে তার এই বার্তার মূল ভিত্তি হলো নিউইয়র্ককে এমন একটি শহর হিসেবে গড়ে তোলা যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার একসাথে চলবে। ‘আজ এক নতুন যুগের শুরু’– ভাষণটি এভাবেই শুরু করেন জোহরান মামদানি। তারপর ধন্যবাদ জানালেন সবাইকে, নিউইয়র্কের মেয়র পদে তাঁকে বিজয়ী করার জন্য।
মেয়র নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার পর থেকে আলোচিত মামদানি যে ভাষণটি দিয়েছেন, তা এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ ভাষণটি এখানে তুলে ধরা হলো—
আমার প্রিয় নিউইয়র্কবাসী, আজ নতুন এক যুগের সূচনা হলো।
এই পবিত্র শপথ নেওয়ার সৌভাগ্য হওয়ায় আমি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত; বিনম্র শ্রদ্ধা আপনাদের প্রতি, আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য। নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম বা ১১২তম মেয়র হিসেবে আপনাদের সেবা করার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত। তবে এখানে আমি একা নই। আমি আপনাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে, লোয়ার ম্যানহাটানে আজ এখানে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের সঙ্গে, যাঁদের আশার বাতিতে চাপা পড়ছে জানুয়ারির শীত।
আমি দাঁড়িয়ে আছি আরও অসংখ্য নিউইয়র্কবাসীর পাশে, যাঁরা দেখছেন ইস্ট নিউইয়র্কের সংকীর্ণ রান্নাঘর থেকে শুরু করে সেলুনে বসে টিভিতে চোখ রেখে; লাগুয়ার্ডিয়ার পার্ক করা ট্যাক্সির ড্যাশবোর্ডে ঠেস দিয়ে রাখা মুঠোফোন থেকে, মট হ্যাভেনের হাসপাতাল থেকে, আর এল বারিওর সেই লাইব্রেরিগুলো থেকে, যেগুলো বহুদিন ধরে পড়ে আছে অবহেলাকে নিয়তি মেনে নিয়ে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি লোহার বুট পরা সেই সব নির্মাণশ্রমিকের পাশে, সারা দিন কাজ করে হাঁটুর ব্যথায় অবশ সেই সব গাড়ির দোকানিদের পাশে, যাঁরা হালাল পণ্য বিক্রি করেন।
আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই সব প্রতিবেশীর পাশে, যাঁরা এই হলের শেষ প্রান্তের বৃদ্ধ দম্পতির জন্য খাবারের থালা নিয়ে যান; যাঁরা তাড়াহুড়ার মধ্যেও সাবওয়ের সিঁড়িতে অপরিচিতের স্ট্রলার তুলে দেন; এবং সেই মানুষগুলোর পাশে, যাঁরা প্রতিদিন কষ্টের মধ্যে এই শহরটিকে নিজের ঘর বলেই ভাবেন।
আজ এখানে উপস্থিত শ্রমিক ও অধিকারকর্মীদের ধন্যবাদ। ধন্যবাদ কর্মচারী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও, যাঁরা এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার নিউইয়র্কবাসীর জন্য কর্মযুদ্ধে ফিরবেন। ধন্যবাদ সেই শিল্পীদের, যাঁরা তাঁদের প্রতিভা আমাদের উপহার দিয়েছেন।
গভর্নর হোকুলকে (নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল) ধন্যবাদ। মেয়র অ্যাডামসকেও (বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস) ধন্যবাদ; ডরোথির সন্তান, ব্রাউনসভিলের সেই ছেলে, যিনি বাসন মাজার কাজ থেকে আমাদের শহরের সর্বোচ্চ পদে উঠেছেন, আজ এখানে উপস্থিত থাকার জন্য। আমাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে, তবু আমি সব সময়ই কৃতজ্ঞ থাকব; কারণ, তিনি আমাকে সেই মেয়র প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যিনি বদ্ধ কোনো ঘরে সঙ্গী হিসেবে আমাকে বেছে নিতে চাইতেন।
ধন্যবাদ সেই দুই মহীরুহকে, যাঁদের কংগ্রেস সদস্য হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, নিদিয়া ভেলাসকেজ ও আমাদের অসাধারণ উদ্বোধনী বক্তা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, যাঁরা এই মুহূর্তটি তৈরি করার পথ করে দিয়েছেন।
ধন্যবাদ সেই মানুষটিকে, যাঁর নেতৃত্ব আমি সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করতে চাই, এবং যাঁর হাতেই আজ আমি শপথ নিচ্ছি—সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।
ধন্যবাদ আমার টিমকেও, অ্যাসেম্বলি থেকে শুরু করে প্রচার, রূপান্তর পর্ব হয়ে এখন সিটি হল থেকে যাঁদের নেতৃত্ব দিতে পেরে আমি উচ্ছ্বসিত।
ধন্যবাদ আমার মা–বাবাকে ( মীরা নায়ার ও মাহমুদ মামদানি) আমাকে বড় করে তোলার জন্য, এই পৃথিবীতে কীভাবে থাকতে হয়, তা শেখানোর জন্য, আর আমাকে এই শহরে নিয়ে আসার জন্য। ধন্যবাদ আমার পরিবারকে, কাম্পালা (উগান্ডার রাজধানী, মাহমুদ মামদানির পৈতৃক নিবাস) থেকে দিল্লি পর্যন্ত।
সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ নিউইয়র্কের জনগণকে।
তবু আমরা জানি, আমাদের অতীতে বহুবার সম্ভাবনার মুহূর্তগুলো সংকীর্ণ কল্পনা আর আরও সংকীর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে, যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কখনো পূরণ হয়নি; যা বদলাতে পারত, তা একই রকম রয়ে গেছে। যাঁরা সবচেয়ে বেশি এই শহরকে নতুন করে গড়তে চেয়েছেন, তাঁদের জন্য বোঝা আরও ভারী হয়েছে, অপেক্ষার প্রহর হয়েছে দীর্ঘ।
এই ভাষণ যখন লিখছিলাম, তখন আমাকে বলা হয়েছিল, প্রত্যাশা কমাতে, নিউইয়র্কবাসীকে কম চাওয়ার আর আরও কম আশা করার আহ্বান জানাতে। আমি তা করব না। আমি কেবল একটি প্রত্যাশাই বদলাতে চাই, তা হলো ছোট প্রত্যাশার আশা।
আজ থেকে আমাদের প্রশাসন হবে সাহসী। আমরা সব সময় সফল না–ও হতে পারি, কিন্তু সামনে এগিয়ে চলার সাহসের অভাবের কথা যেন কেউ বলতে না পারে।
যাঁরা বলেন, বড় সরকারের যুগ শেষ, আমি তাঁদের স্পষ্ট করে বলতে চাই, নিউইয়র্কবাসীর জীবনমান উন্নত করতে সিটি হল কর্তৃপক্ষ তার ক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করবে।
আমরা শ্রেষ্ঠত্ব আশা করব মসলা পেষা রাঁধুনিদের কাছ থেকে, ব্রডওয়ের মঞ্চে ওঠা শিল্পীদের কাছ থেকে, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের প্রহরীদের কাছ থেকে। সরকারে কাজ করা মানুষের কাছ থেকেও সেটাই চাইব। ‘সিটি হল’ শব্দটিকে আমরা সমাধান ও ফলাফলের প্রতিশব্দে পরিণত করব।
এই কাজ শুরু করতে গিয়ে আমরা সেই চিরন্তন প্রশ্নের নতুন উত্তর দেব—নিউইয়র্ক কার?
আমাদের ইতিহাসের বড় অংশে সিটি হলের উত্তর ছিল সহজ—এটি ধনী ও ক্ষমতাবানদের, যাঁদের কখনো ক্ষমতাশালীদের দৃষ্টি আকর্ষণে কষ্ট করতে হয় না।
এর ফল ভোগ করেছেন শ্রমজীবী মানুষেরা। ঠাসা শ্রেণিকক্ষ, যেখানে লিফট নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে; গর্তে ভরা রাস্তা আর আধা ঘণ্টা দেরিতে আসা বাস; না বাড়া মজুরি আর ভোক্তা ও কর্মচারী দুজনকেই ঠকানো করপোরেশন।
তার মধ্যেও কিছু ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত এসেছে, যখন এই সমীকরণ বদলেছে।
১২ বছর আগে বিল ডি ব্লাসিও ঠিক এখানেই দাঁড়িয়ে আমাদের শহরকে দুই ভাগ করা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
আর প্রায় ছয় দশক আগে ফিওরেলো লা গার্ডিয়া ক্ষমতায় এসে ক্ষুধার্ত ও দরিদ্র মানুষের জন্য আরও মহান ও সুন্দর শহর গড়ার লক্ষ্য নিয়েছিলেন।
এই মেয়রদের কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে বেশি সফল ছিলেন। কিন্তু এই বিশ্বাসে তাঁরা ছিলেন অভিন্ন, তা হলো, নিউইয়র্ক কেবল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের জন্য নয়। এই শহর তাঁদেরও, যাঁরা আমাদের সাবওয়ে ট্রেন চালান, পার্ক পরিষ্কার করেন; যাঁরা আমাদের বিরিয়ানি আর বিফ প্যাটি, কিংবা পিকানহা এবং রাই ব্রেডের পাস্তরামি খাইয়ে তৃপ্ত করেন। তাঁরা জানতেন যে এই বিশ্বাস তখনই বাস্তবে রূপ পাবে, যদি সরকার সেসব পরিশ্রমী মানুষের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার সাহস দেখায়।
আগামী বছরগুলোয় আমার প্রশাসন সেই উত্তরাধিকার পুনরুজ্জীবিত করবে। সিটি হল দেবে নিরাপত্তা, সাশ্রয়যোগ্যতা ও প্রাচুর্যের কর্মসূচি, যেখানে সরকার হবে যাদের প্রতিনিধিত্ব করে, তাদের মতো; করপোরেট লোভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কখনো পিছু হটবে না; আর যেসব চ্যালেঞ্জকে অন্যরা জটিল বলে এড়িয়ে গেছে, সেগুলোর সামনে মাথানত করবে না।
এভাবেই আমরা সেই পুরোনো প্রশ্নের নিজেদের উত্তর দেব—নিউইয়র্ক কার? বন্ধুরা, মাদিবার কথা আর দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্রিডম চার্টার থেকে আমরা উত্তর পাই: নিউইয়র্ক ‘এখানে বসবাসকারী সবার’।
একসঙ্গে আমরা আমাদের শহরের নতুন গল্প লিখব। এটি কেবল ১ শতাংশের দ্বারা শাসিত এক শহরের গল্প হবে না। আবার ধনী বনাম গরিব—দুটি শহরের গল্পও হবে না। এটি হবে ‘৮৫ লাখ’ শহরের গল্প—প্রত্যেকেই একজন নিউইয়র্কবাসী, প্রত্যেকেরই আশা ও ভয় আছে, প্রত্যেকেই একটি মহাবিশ্ব, আর সবাই গাঁথা থাকবে একে অন্যের সঙ্গে।
এই গল্পের লেখকেরা পশতু ও মান্দারিন, ইদ্দিশ (ইহুদির একটি অংশের ভাষা) ও ক্রিওল (ক্যারিবিয়ান) ভাষায় কথা বলবেন। তাঁরা প্রার্থনা করবেন মসজিদে, সিনাগগে, গির্জায়, গুরুদুয়ারায়, মন্দিরে, আর অনেকে হয়তো তা করবেনই না।
তারা হবেন ব্রাইটন বিচের রুশ ইহুদি অভিবাসী, রসভিলের ইতালিয়ান, উডহ্যাভেনের আইরিশ পরিবার—যাঁদের অনেকেই এসেছিলেন উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে, যা এখন মলিন। তাঁরা হবেন মার্বেল হিলের সংকীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকা তরুণেরা, যেখানে ট্রেন গেলে দেয়াল কেঁপে ওঠে। তাঁরা হবেন সেন্ট অ্যালব্যান্সের কৃষ্ণাঙ্গ গৃহস্বামী, যাঁদের ঘর দশকের পর দশক কম মজুরি আর প্রান্তিক অবস্থান জয়ের সংগ্রামে রয়েছে। তাঁরা হবেন বে রিজের ফিলিস্তিনি নিউইয়র্কবাসী, যাঁদের আর এমন রাজনীতির মুখোমুখি হতে হবে না, যা তাঁদের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখায়।
এই ৮৫ লাখ মানুষের খুব কমই এক ঝুড়িতে থাকতে পারবেন। কেউ কেউ হবেন হিলসাইড অ্যাভিনিউ বা ফোর্ডহ্যাম রোডের ভোটার, যাঁরা এক বছর আগে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে নিজেদের দলের ব্যর্থতায় ক্লান্ত হয়ে শেষে পরে আমাকে ভোট দিয়েছেন। অধিকাংশই সেই ভাষায় কথা বলবেন না, যেটা আমরা ক্ষমতাবানদের কাছ থেকে আশা করি। আমি এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভদ্রতার সুন্দর বচনে আড়াল করে রাখা হয়েছে নিষ্ঠুরতাকে।
তাঁদের অনেকেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার কাছে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন। কিন্তু আমাদের প্রশাসনে তাঁদের কথাও শুনবে। তাঁদের আশা, স্বপ্ন ও স্বার্থ স্বচ্ছভাবে সরকারের মধ্যে প্রতিফলিত হবে। তাঁরাই গড়বেন আমাদের ভবিষ্যৎ।
আর যদি এত দিন এই গোষ্ঠীগুলো দূরত্ব বজায় রেখে থেকেও থাকে, আমাদের শহর তাঁদের আরও কাছে টানবে। কঠোর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বরফ গলাব আমরা সামষ্টিকতার উষ্ণতায়। আমাদের প্রচারণা যদি প্রমাণ করে থাকে যে নিউইয়র্কবাসী সংহতির জন্য আকুল, তবে এই সরকার তা লালন করবে। কারণ, আপনি কী খান, কীভাবে প্রার্থনা করেন, বা কোথা থেকে এসেছেন, তা মুখ্য নয়; আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সেই দুটি শব্দ—নিউইয়র্কবাসী।
নিউইয়র্কবাসীই ভঙ্গুর সম্পত্তি করব্যবস্থা সংস্কার করবে। নিউইয়র্কবাসীই গড়ে তুলবে কমিউনিটি নিরাপত্তা বিভাগ, যা মানসিক স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলা করবে এবং পুলিশকে তাদের আসল কাজ করতে দেবে। নিউইয়র্কবাসীই বাজে বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং ছোট ব্যবসায়ীদের অপ্রয়োজনীয় আমলাতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে। আর আমি গর্বিত যে আমি নিজেও সেই নিউইয়র্কবাসীর একজন।










