যে ৪ কারণে গাজায় যুদ্ধবিরতি চান না নেতানিয়াহু

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফর শেষ হয়েছে এক অভাবনীয় রাজনৈতিক জয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রত্যাবর্তনের পর এই প্রথম দুই নেতার বৈঠকে নেতানিয়াহু যা চেয়েছিলেন, তা কার্যত আদায় করে নিয়েছেন। গত সোমবারের বৈঠকের পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘বীর’ বলে অভিহিত করেছেন এবং গাজা পরিকল্পনায় তাকে ‘শতভাগ সফল’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন।
তবে এই বাহ্যিক সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি দিলেও নেতানিয়াহুর প্রকৃত লক্ষ্য গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং নিজের টালমাটাল ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেওয়া।
কট্টরপন্থি চাপ ও ‘ধীরগতি’ কৌশল
নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থি। সরকারের অন্যতম স্তম্ভ জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়কমন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গাজায় যেকোনো ধরনের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা বন্দি মুক্তির বিনিময় চুক্তির তারা ঘোরবিরোধী।
অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ-নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ‘ধীরগতি’ নীতি অবলম্বন করছেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সন্দেহ, নেতানিয়াহু আসলে হামাসের বিরুদ্ধে সুবিধামতো সময়ে আবার যুদ্ধ শুরু করার পথ খোলা রাখতে চান। তিনি গাজায় কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করতেও আগ্রহী নন। কারণ গাজা সংঘাতের ‘আন্তর্জাতিকীকরণ’ হলে ইসরায়েলের একচ্ছত্র সামরিক স্বাধীনতা খর্ব হবে।
দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও বসতি স্থাপনের রাজনীতি
নেতানিয়াহু দীর্ঘকাল ধরেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণার তীব্র বিরোধী। ২০১৫ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই বিরোধিতার কথা জানিয়ে আসছেন। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে ‘উন্মাদনা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বাস্তব ক্ষেত্রেও তার মন্ত্রীরা পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন করে ইহুদি বসতি গড়ার কাজ শুরু করেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় আজীবন থেকে যাবে, যা ভবিষ্যতে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করবে। এটি মূলত দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাবনাকে কার্যত কবর দেওয়ারই নামান্তর।
ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কেন সংঘাত প্রয়োজন?
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ মনে করেন, নেতানিয়াহু বর্তমানে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী বছরে তিনি বড় ধরনের জনরোষের মুখে পড়ার আশঙ্কায় আছেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ভার এখনো তার ওপর চেপে আছে।
এই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর জন্য ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ পরিচয় ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। হামাস, হিজবুল্লাহ কিংবা ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা তাকে জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। যুদ্ধ থেমে গেলে তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভারসাম্য
নেতানিয়াহুর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-কট্টরপন্থি মিত্রদের খুশি রাখা এবং একই সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন বজায় রাখা। তিনি চান না ট্রাম্পের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে, আবার চান না গাজার নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক হাতে ছেড়ে দিতে। নেতানিয়াহু বর্তমানে এমন এক অবস্থানে আছেন যেখানে তিনি পরিস্থিতির স্থিতাবস্থা বজায় রাখতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই ‘সব পেয়েছি’র সফর শেষ পর্যন্ত গাজায় স্থায়ী শান্তি আনবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। বরং এটি হয়তো এক দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব এবং নতুন কোনো সংঘাতের সোপান মাত্র।

 

-এম. এইচ. মামুন