২০২৫ সালে দেশের পোশাক খাতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এ বছরে মোট ৩৮টি পোশাক কারখানা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সবুজ কারখানার সনদ ‘লিড’ অর্জন করেছে, যা এর আগে কোনো বছর হয়নি। বর্তমানে অধিকাংশ নতুন কারখানাই লিড মানদণ্ড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হচ্ছে এবং প্রায় ৬০০ কারখানা এই সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বিবেচনা করে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে লিড সনদ দিয়ে থাকে। এই সনদের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত হয় এবং এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যে ‘গ্রিন ট্যাগ’ যুক্ত থাকায় সচেতন ক্রেতা ও বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে এর চাহিদা বেশি থাকে। ফলে বাজারে দরকষাকষিতে সুবিধা হয় এবং দেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তিও উন্নত হয়।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী বছরে লিড সনদপ্রাপ্ত ৩৮টি কারখানার মধ্যে ২২টি প্লাটিনাম মানের, যা সর্বোচ্চ ক্যাটেগরি। এছাড়া ১১টি কারখানা গোল্ড এবং ৫টি সিলভার ক্যাটেগরির সনদ পেয়েছে। এর আগে ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ৩০টি কারখানা লিড সনদ অর্জন করেছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৪ ও ২৬টি।
দেশের শিল্প খাতে ২০১১ সালে মাত্র দুটি কারখানার মাধ্যমে লিড সনদের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে সবুজ সনদপ্রাপ্ত পোশাক কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭০টিতে। এর মধ্যে প্লাটিনাম ১১৪টি, গোল্ড ১৩৭টি, সিলভার ১৫টি এবং সাধারণ লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানা রয়েছে ৪টি।
দেশের শিল্পখাতে পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন কারখানার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে গ্রিন কারখানার বিস্তার রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ বর্তমানে বৈশ্বিক উদ্বেগের অন্যতম বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। গ্রিন কারখানায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি কমানো হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন কারখানায় বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হয়। সৌরবিদ্যুৎ, এলইডি আলো, উন্নত বয়লার ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রিন কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ড এবং সচেতন ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব পণ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানার পণ্যে ‘গ্রিন ট্যাগ’ থাকায় রপ্তানিতে দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা মিলছে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ছে এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।
গ্রিন কারখানার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরাপদ ভবন কাঠামো ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে কাজ করায় শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। এতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও অসন্তোষ কমে আসে, যা শিল্পখাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রিন শিল্পায়নের ফলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শক্তিশালী হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পাচ্ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে শিল্পখাতে গ্রিন কারখানার সংখ্যা আরও বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে, কর্মসংস্থান নিরাপদ হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে
আফরিনা সুলতানা/










