ভয়ংকর ২০২৫- বছরজুড়ে আলোচিত ছিল যেসব হত্যাকাণ্ড

সুশান্ত সাহা:
২০২৫ সাল জুড়ে অসংখ্য খুনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব খুনের মধ্যে অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ড কাঁপিয়েছে দিয়েছিলো গোটা দেশকে। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি হত্যা, ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ইসলাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কথিত অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবককে নির্মমভাবে প্রহার পরে গাছে ঝুলিয়ে দগ্ধ করে হত্যা ও গত ৯ অক্টোবর রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের পূর্ব বিরোধের জেরে মো. সোহাগ চান নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা। এ সকল হত্যার ঘটনায় সারাদেশের প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সর্বশেষ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় বিপাকে পরে সরকার। গত কয়কদিন ধরে বিচারের দাবিতে ঢাকাসহ সারাদেশ উত্তাল।
জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা – ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে প্রচার চালানো জুলাইযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকাকালে সিঙ্গাপুরে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে টার্গেট কিলিং হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ওসমান হাদির কিলিং মিশয়ে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম দাউদ ওরফে মাসুদ এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আলমগীর শেখকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় দেশ বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
ভালুকায় ধর্মীয় অভিযোগে যুবক হত্যার ঘটনা: ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবককে নির্মমভাবে প্রহার, গাছে ঝুলিয়ে এবং দগ্ধ করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনাটি মব সহিংসতার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে আলোচিত হয়।
মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী হত্যা : গত ৯ অক্টোবর রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের সামনে চোরাই তারের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে এবং পূর্ব বিরোধের জেরে মো. সোহাগ চান নামে এক ভাঙারি ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যকারীদের সঙ্গে পূর্ব বিরোধের জেড়ে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হত্যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়। যদিও নিহত সোহাগও একটি হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করে।
মাদারীপুরে মসজিদের ভেতরে হত্যাকাণ্ড: চলতি বছরের ৮ মার্চে মাদারীপুর সদর উপজেলায় বালু ব্যবসার বিরোধের জেড়ে ৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। প্রাণ বাঁচতে হামলার শিকার ব্যক্তিরা একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিলেও হত্যাকারীরা মসজিদের মধ্যে ঢুকেই তাদের কুপিয়ে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে। নিহতরা একই পরিবারের লোক এবং সম্পর্কে ভাই হয়। খুনিরা নৃশংস হত্যার পর উল্ল্যাস করতে করতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ ঘটনায় পরে আহত একজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা ৪ জনে দাঁড়ায়। ওই ঘটনার পরদিন নিহত সাইফুল সরদারের মা সুফিয়া বেগম ৪৮ জনের নামে মামলা করেন। পরে মামলার প্রধান আসামি হোসেন সরদারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
খুলনায় যুবদল নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা: গত ৯ অক্টোবর খুলনার দৌলতপুর থানা যুবদলের সাবেক নেতা মোল্লা মাহবুবুর রহমানকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওইদিন খুলনা মহানগরের দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় নিজ বাড়ির সামনে তাকে গুলি করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলাটি এখনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনাটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে আলোচিত হয়।
লক্ষ্মীপুরে মা ও মেয়েকে হত্যা : একই দিনে গত ৯ অক্টোবর লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে জুলেখা বেগম ও তাঁর কলেজপড়ুয়া মেয়ে তানহা আক্তার মীমকে নিজ বাড়িতে হত্যা করে স্বর্ণালংকার লুট করা হয়। এই নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন হত্যা : ২৫ মে রাতে বাড্ডা এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে দোকানের সামনে বসে চা পান করছিলেন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন। এমন সময় হঠাৎ দুজন লোক তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডে কারা অংশগ্রহণ করেছে, হত্যার নেপথ্যে কারা কিংবা কেন সাধনকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও ব্যবসা, আধিপত্য এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারের সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে। ১১ নভেম্বর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে। আদালতপাড়ায় মামুনকে হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জের পশ্চিম লতিফপুর এলাকায় ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৭ নভেম্বর পল্লবীতে একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে প্রবেশ করে মুখোশ ও হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে। আগের মাসে চট্টগ্রামে চলন্ত প্রাইভেটকার থামিয়ে প্রকাশ্যে দিনদুপুরে বিএনপি সমর্থিত এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছরের ৭ আগস্ট গাজীপুরে আসাদুজ্জামান তুহিন নামে এক সাংবাদিককে ফিল্মি কায়দায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

এছাড়াও ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মব জাস্টিস বা গণপিটুনিতে মৃত্যু:
২০২৫ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গণপিটুনির ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ১৯৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও মৃত্যু:
বছরের বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৯০ জন সদস্য নিহত বা রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন।

রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা:
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পায়।
জুলাই মাসে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও গণ-আক্রমণে সারাদেশে ২৫ জন নিহত হন।
১৭ জুলাই ফরিদপুরে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে দেশে মোট ২,৯১১টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

মামুন/