ইংরেজি নববর্ষ: ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে সভ্যতার ইতিহাস

একটি বছর বিদায় নেয়, শুরু হয় নতুন বছরের গণনা। ১ জানুয়ারি আজকের বিশ্বে যাকে আমরা ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে জানি, তার ইতিহাস কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। ক্যালেন্ডারের এই পাতার পেছনে আছে হাজার বছরের সভ্যতা, সংস্কার, ধর্মীয় প্রভাব আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘ গল্প।

শুরুটা

ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাসের শেকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় চার হাজার বছর আগে, প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতায়। তখন নতুন বছর শুরু হতো বসন্তকালে মার্চ মাসে। প্রকৃতির নবজাগরণ, ফসল ফলার সময় এবং কৃষিকাজের সূচনার সঙ্গে মিলিয়েই বছরের শুরু নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এই ধারাই বহাল ছিল প্রাচীন রোমান সভ্যতায়ও। রোমান ক্যালেন্ডারে মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস, আর সে কারণেই আজও সেপ্টেম্বর (৭), অক্টোবর (৮), নভেম্বর (৯) ও ডিসেম্বর (১০) এই মাসগুলোর নামের সঙ্গে সংখ্যাগত অসামঞ্জস্য দেখা যায়।

জানুয়ারির আবির্ভাব

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ সালে রোমানরা বছরের শুরু মার্চ থেকে সরিয়ে নেয় জানুয়ারিতে। জানুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয় রোমান দেবতা জেনাস-এর নামে, যিনি সময়, সূচনা ও পরিবর্তনের প্রতীক। জেনাসের দুটি মুখ একটি অতীতের দিকে, অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে নতুন বছরের ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়।

জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ও ভুলের শুরু

খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার চালু করেন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। এতে বছর ধরা হয় ৩৬৫ দিন, আর প্রতি চার বছরে একটি অধিবর্ষ। যদিও এটি আগের তুলনায় উন্নত ছিল, তবু সূর্য বর্ষের সঙ্গে সামান্য পার্থক্য রয়ে যায়। শত শত বছরে সেই ছোট ভুল জমতে থাকে।

খ্রিষ্টধর্ম ও বিভক্ত নববর্ষ

মধ্যযুগে ইউরোপে খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানুয়ারিতে নববর্ষ পালনের বিষয়টি বিতর্কিত হয়ে ওঠে। অনেক দেশে নতুন বছর শুরু হতো ২৫ মার্চ (লেডি ডে), কোথাও ইস্টারের সময়। ফলে ইউরোপজুড়ে একসময় একাধিক “নববর্ষের দিন” প্রচলিত ছিল।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের জন্ম

এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটে ১৫৮২ সালে। ক্যাথলিক চার্চের উদ্যোগে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ চালু করেন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। এতে অতিরিক্ত দিন বাদ দিয়ে ক্যালেন্ডারকে সূর্য বর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। একই সঙ্গে ১ জানুয়ারিকেই আনুষ্ঠানিক নববর্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ধীরে ধীরে ইউরোপের অন্যান্য দেশও এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তবে ব্রিটেন ও তার উপনিবেশগুলো এটি গ্রহণ করে আরও দেরিতে ১৭৫২ সালে।

উপমহাদেশে ইংরেজি নববর্ষ

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজি নববর্ষের প্রচলন হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রশাসনিক কাজ, সরকারি হিসাব এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রয়োজনে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও ১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্ব পায়।

আধুনিক নববর্ষ: উৎসব ও প্রতিজ্ঞা

আজকের দিনে ইংরেজি নববর্ষ কেবল একটি তারিখ নয়, এটি হয়ে উঠেছে উৎসব, আত্মসমালোচনা ও নতুন শুরুর প্রতীক। আতশবাজি, কাউন্টডাউন, শুভেচ্ছা বিনিময় আর ‘নিউ ইয়ার রেজ্যুলেশন’ সব মিলিয়ে নববর্ষ এখন বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ।

সময়ের সাক্ষী একটি দিন

হাজার বছরের পরিবর্তন, ধর্মীয় বিতর্ক, ক্যালেন্ডার সংস্কার আর ঔপনিবেশিক ইতিহাস পেরিয়ে ১ জানুয়ারি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাই ইংরেজি নববর্ষ মানে শুধু একটি দিনের পরিবর্তন নয়— এটি মানবসভ্যতার সময় গণনার দীর্ঘ অভিযাত্রার স্মারক।

নতুন বছরের ভোরে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালে তাই শুধু একটি বছর নয়, চোখে পড়ে ইতিহাসের বিস্তৃত পথচলা, যেখান থেকে শুরু হয়ে আজকের এই ১ জানুয়ারিতে এসে পৌঁছেছে পৃথিবী।

-আবদুল মোমিন