সুদানের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর এল-ফাশার থেকে পালিয়ে আসা মানুষের স্রোতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাস্তুচ্যুতদের শিবিরগুলো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, শুধু একটি শিবিরই এখন প্রায় ৫ লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ।
আল জাজিরার সানাদ তদন্ত সংস্থার পর্যালোচিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, এল-ফাশারের উত্তর-পশ্চিমে ছোট শহর কারনিতে গড়ে ওঠা একটি শিবির ডিসেম্বরের ১৪ থেকে ২৯ তারিখের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার বর্গমিটার বেড়েছে। বর্তমানে শিবিরটির মোট আয়তন প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার বর্গমিটার।
এর চেয়েও বড় আরেকটি শিবির গড়ে উঠেছে সুদানের নর্দার্ন স্টেটে, এল-ফাশার থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে আল-দাব্বা শহরের কাছে। এল-আফাধ নামে পরিচিত এই শিবিরটি নভেম্বরের ১৯ তারিখের পর থেকে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার বর্গমিটার বেড়ে এখন কমপক্ষে ৫ লাখ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।
এই স্যাটেলাইট চিত্রগুলো সুদানের ৩২ মাস ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধের সর্বশেষ অধ্যায়ে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়া কয়েক দশ হাজার মানুষের স্রোতকে নিশ্চিত করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরের শেষ দিক থেকে এল-ফাশার ও আশপাশের এলাকা থেকে অন্তত ১ লাখ ৭ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ওই সময়েই আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) শহরটি দখল করে এবং বর্ণবিদ্বেষপ্রসূত হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা ও গণগ্রেপ্তারের মতো নৃশংস অভিযান চালায় বলে বেঁচে ফেরা মানুষদের অভিযোগ।
ডিসেম্বরের শুরুতে আল-দাব্বার শিবিরে কয়েক সপ্তাহ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা চিকিৎসক নাবিহা ইসলাম জানান, সেখানে হাজার হাজার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ আশ্রয় নিতে থাকলেও খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সম্পদের মারাত্মক সংকট রয়েছে।
এল-ফাশার প্রায় ধ্বংসস্তূপ
গত সপ্তাহে শহরটি দখলের পর প্রথমবারের মতো এল-ফাশার পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের একদল ত্রাণকর্মী। তারা শহরটিকে প্রায় জনশূন্য ও একটি “অপরাধস্থলের” মতো বলে বর্ণনা করেন।
জাতিসংঘের ত্রাণ সমন্বয়ক ডেনিস ব্রাউন বলেন, “এল-ফাশার তার আগের রূপের এক প্রেতচ্ছায়া মাত্র। কত মানুষ এখনো সেখানে রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়, তবে আমরা জানি শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।” তিনি আরও জানান, শহরে থাকা কিছু মানুষ এখনো বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ছাড়াই মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে দেশটির এই যুদ্ধ শুরু হয়। এ পর্যন্ত এতে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে ৪৩ লাখের বেশি মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে গেছে। যুদ্ধের কারণে দেশের বিভিন্ন অংশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, যাকে জাতিসংঘ “বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এল-ফাশার ছিল দারফুর অঞ্চলে সরকারপন্থী এসএএফের শেষ বড় ঘাঁটি, যা অবশেষে আরএসএফের হাতে পড়ে। আরএসএফের শিকড় রয়েছে সরকার-সমর্থিত জানজাওয়িদ মিলিশিয়ায়, যারা ২০০০-এর দশকের দারফুর সংঘাতে অ-আরব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত।
এল-ফাশার দখলের পর আরএসএফ এখন পূর্ব দিকে কর্দোফান অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এতে নতুন করে আরও প্রায় ৫৩ হাজার মানুষ শরণার্থী হয়েছে।
সুদানে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশনপ্রধান মোহাম্মদ রেফাত সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ কর্দোফানের কাদুগলি শহরের আশপাশে যদি দ্রুত যুদ্ধবিরতি না হয়, তবে “এল-ফাশারে যে মাত্রার সহিংসতা আমরা দেখেছি, তা আবারও পুনরাবৃত্তি হতে পারে।”










