পদ্মার চরে শিয়ালের তাণ্ডবঃ ২০০ গরু-মহিষ জখম, আহত দুই কৃষক

পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের বাথানে একদল শিয়ালের নজিরবিহীন হামলায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার ‘ষাটবিঘা’ চরে গত ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দফায় দফায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। শিয়ালের কামড়ে অন্তত ২০০টি গরু ও মহিষ রক্তাক্ত জখম হয়েছে। শুধু পশুই নয়, শিয়ালের হাত থেকে রক্ষা পাননি কৃষকেরাও। দুই কৃষক গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং শিয়ালের তাড়া খেয়ে প্রাণ বাঁচাতে চার কৃষক নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চরের বিস্তীর্ণ মাঠে শত শত গরু-মহিষ বাথানে রেখে কৃষকরা রাতে বাড়ি ফেরেন। ২১ ডিসেম্বর ভোরে বাথানে গিয়ে তারা দেখেন, কয়েকশ গরু ও মহিষ দিগ্বিদিক ছুটছে। অনেক পশুর নাক, মুখ ও কান ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং রক্ত ঝরছে। কৃষক সিজন আলী জানান, তার ৪০টি গরুর মধ্যে ২৬টি এবং ৩টি মহিষকে শিয়াল কামড়ে জখম করেছে। আরেক কৃষক মাহমুদ সুজন আলীর ২০টি গরুও একইভাবে আক্রান্ত হয়েছে।

কৃষকদের দাবি, বাথানগুলো জাল বা নেট দিয়ে ঘেরা না থাকায় শিয়ালের দল সহজে ভেতরে ঢুকে হামলা চালায়। হামলার পর সকালেও অন্তত ছয়টি শিয়ালকে বাথানের আশেপাশে মহড়া দিতে দেখা গেছে।

শিয়ালের দল কেবল পশুকে আক্রমণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, মানুষের ওপরও হিংস্র হয়ে উঠেছে। চরের বাসিন্দা আফসার আলী ও তার চাচাশ্বশুর আক্কাস আলী শিয়ালের সরাসরি হামলার শিকার হন। আফসার আলী জানান, কৃষি কর্মকর্তাকে জমি দেখাতে যাওয়ার সময় একটি শিয়াল অনেকটা বাঘের মতো লাফিয়ে তার মুখে কামড় দেয়। এতে তার ঠোঁট ও হাতের আঙুল মারাত্মক জখম হয়। পরে হাঁসুয়ার আঘাতে শিয়ালটিকে তাড়ানো সম্ভব হয়। এছাড়া অন্য একটি এলাকায় চারজন পেঁয়াজ চাষিকে শিয়াল তাড়া করলে তারা ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির জানান, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস শিয়ালের প্রজনন মৌসুম। এই সময়ে তারা কিছুটা আক্রমণাত্মক থাকে। এছাড়া খাদ্যের অভাব বা মানুষ কর্তৃক বিরক্ত হলেও তারা এমন আচরণ করতে পারে। জানা গেছে, ঘটনার আগের দিন চরখানপুরে দুটি রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলেছিল, যা অন্য শিয়ালরা প্রত্যক্ষ করে। স্থানীয়দের ধারণা, এটি সেই ঘটনার প্রতিশোধ হতে পারে।

আহত দুই কৃষক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এ বছর শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত বছর ১৭৬ জন চিকিৎসা নিলেও এ বছর ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

এদিকে, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে আহত ২০০ গরু ও মহিষকে ভ্যাকসিনের প্রথম দুই ডোজ দেওয়া হয়েছে। পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিয়ালের হিংস্র আচরণের প্রমাণ পেয়েছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আতোয়ার রহমান জানান, ওষুধের পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে গবাদিপশুগুলোর পাঁচ ডোজ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমানে চরের বাসিন্দারা লাঠিসোটা ছাড়া চলাফেরা করতে সাহস পাচ্ছেন না। বাথান মালিক ও কৃষকদের মধ্যে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।

-এম. এইচ. মামুন