পৃথিবীর মানচিত্রে অ্যান্টার্কটিকা আজও এক রহস্যময় মহাদেশ। মাইলের পর মাইল পুরু বরফের চাদরে ঢাকা এই জনশূন্য প্রান্তরের গভীরে কী লুকিয়ে আছে, তা জানতে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। সম্প্রতি কৃত্রিম উপগ্রহ এবং আধুনিক রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে অ্যান্টার্কটিকার কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফের নিচে এমন কিছু ‘অদ্ভুত’ কাঠামোর সন্ধান মিলেছে, যা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই আবিষ্কার কেবল ভূ-তাত্ত্বিকদেরই নয়, ভাবিয়ে তুলেছে প্রত্নতাত্ত্বিকদেরও।
কী এই অদ্ভুত কাঠামো?
বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব দিকে বরফের নিচে বিশাল কিছু জ্যামিতিক কাঠামোর অস্তিত্ব টের পেয়েছেন। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, এগুলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পাহাড় বা উপত্যকার চেয়েও অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। কোনো কোনো কাঠামো মাইলের পর মাইল বিস্তৃত, যা দেখতে অনেকটা বিশালাকার দেয়াল বা পিরামিডের মতো। প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই কাঠামোগুলো প্রায় ১ থেকে ৩ কিলোমিটার বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে।
তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা: তিনটি প্রধান ব্যাখ্যা
এই আবিষ্কার নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক মহলে তিনটি প্রধান বিশ্লেষণ উঠে এসেছে:
১. ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া: অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মতে, এগুলো কোনো কৃত্রিম স্থাপত্য নয়, বরং বরফের প্রচণ্ড চাপে এবং টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে সৃষ্ট পাথুরে কাঠামো। কোটি কোটি বছর আগে অ্যান্টার্কটিকা যখন বরফে ঢাকা ছিল না, তখন সেখানে বিশাল পর্বতশ্রেণী ছিল। বর্তমানের এই কাঠামোগুলো সেই সুপ্রাচীন পাহাড়েরই অবশিষ্টাংশ হতে পারে।
২. সাব-গ্লেসিয়াল লেক বা হ্রদ: অনেক গবেষক মনে করেন, বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল বিশাল হ্রদ বা নদীর প্রবাহের কারণে মাটির স্তরে এমন বিশেষ ধরনের পলল জমেছে, যা উপর থেকে জ্যামিতিক আকার বলে ভ্রম তৈরি করছে।
৩. সুপ্রাচীন সভ্যতার জল্পনা: এই তত্ত্বটি বিজ্ঞান মহলে স্বীকৃত না হলেও বেশ জনপ্রিয়। অনেক গবেষক দাবি করেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে যখন অ্যান্টার্কটিকা বর্তমান অবস্থানের চেয়ে বিষুবরেখার কাছাকাছি এবং উষ্ণ ছিল, তখন সেখানে কোনো উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। তাদের মতে, এই কাঠামো হতে পারে সেই হারানো সভ্যতার কোনো নিদর্শন।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যান্টার্কটিকার এই রহস্যময় কাঠামোর রহস্য সমাধান হওয়া জরুরি কেন? বিজ্ঞানীদের মতে, এর মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস আরও নির্ভুলভাবে জানতে পারব। এছাড়া, এই কাঠামোগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর প্রাণের আদি উৎস এবং কঠিন পরিবেশে প্রাণ কীভাবে টিকে থাকে, তার সূত্র মিলতে পারে। নাসা (NASA)-এর বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অ্যান্টার্কটিকার এই দুর্গম পরিবেশের গবেষণা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহ বা বৃহস্পতির উপগ্রহ ‘ইউরোপা’-তে প্রাণের সন্ধানে সাহায্য করবে।
বর্তমানে এই রহস্য উন্মোচনে ‘আইস-পেনিট্রেটিং রাডার’ এবং ‘লিডার’ (LiDAR) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে বরফ না কেটেই তার ভেতরের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার বরফের তলায় লুকিয়ে থাকা এই কাঠামো কি নিছকই প্রকৃতির খেয়াল, নাকি ইতিহাসের কোনো লুকানো পাতা—তার উত্তর হয়তো সময়ের হাতে। তবে এই আবিষ্কার আবারও প্রমাণ করল যে, মহাকাশ গবেষণার চেয়েও আমাদের পায়ের নিচে পড়ে থাকা এই অজানা পৃথিবী কম রহস্যময় নয়।
-এম. এইচ. মামুন










